চ্যাম্পিয়ন দৌড়বিদ এখন ভাগচাষি

112

রাঙ্গালিবাজনা : মাটির মেঝের ঘরে টিনের বেড়ায় শচীন তেন্ডুলকারের দেওয়া চেকের রেপ্লিকা এখনও টাঙানো। তক্তা কেটে তৈরি করা সেলফে থরে থরে সাজানো নানা মাপের ট্রফি। তার মধ্যে অনেকগুলি প্রথম পুরস্কারের। খয়েরবাড়ি বনাঞ্চলের গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা বাড়িটার টিনের চালার নীচে শুয়ে ছেলেটা একসময আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় দৌড়োনোর স্বপ্ন দেখতেন। সেই স্বপ্ন তাঁকে আরও জোরে ছুটতে সাহায্য করত। তবে বর্তমানে ছুটতে ছুটতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন মাদারিহাট বীরপাড়া ব্লকের দক্ষিণ খয়েরবাড়ির প্রত্যন্ত এলাকার হাসিবুল হক। বহু প্রতিযোগিতায বাকি দৌড়বিদদের পিছনে ফেললেও দারিদ্র‌্যের কাছে হার মানতে বাধ্য হয়েছেন তিনি। মাঝপথে ছাড়তে হয়েছে পড়াশোনা। পেটের টানে বাবার সঙ্গে এখন জমি চাষ করতে হচ্ছে চ্যাম্পিযন হাসিবুলকে। তাও নিজেদের জমি নয়, অন্যের জমিতে ভাগচাষ করছেন তিনি।

অথচ আশপাশের জেলা থেকে শুরু করে কলকাতা, এমনকি ভিনরাজ্যে ম্যারাথনে একাধিকবার চ্যাম্পিযন হয়েছেন হাসিবুল। দৌড়ের প্রতি তাঁর আকর্ষণ ছোটবেলা থেকেই। পঞ্চম শ্রেণিতে পড়াশোনা করার সময় থেকেই দৌড় প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে থাকেন তিনি। অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় থেকে বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় রাজ্যস্তরে অংশ নিতে একাধিকবার কলকাতা গিয়েছেন। স্কুল পড়ার সময়ই পুলিশ বিভাগ আযোজিত ম্যারাথনে অংশ নেন তিনি। মালদার একটি ক্লাবের পরিচালনায ২৬ কিমি ম্যারাথনে ২০১৬ থেকে টানা তিনবার প্রথম হয়ে হ্যাটট্রিক করেন। কয়েক বছর আগে বহরমপুর থেকে কান্দি পর্যন্ত একটি ম্যারাথনেও প্রথম স্থান পান হাসিবুল। বীরপাড়া কলেজে পড়ার সময উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালযে তরফে জাতীযস্তরের প্রতিযোগিতায় প্রতিনিধিত্ব করেন তিনি। ম্যারাথনে অংশ নিতে এর আগে হরিযানাতেও গিয়েছেন হাসিবুল। বেঙ্গালুরুতে ২১ কিমি জাতীয়স্তরের ম্যারাথন প্রতিযোগিতায় পঞ্চদশ স্থান অধিকার করেন তিনি। গুয়াহাটি ম্যারাথনে তৃতীয স্থান পান। কলকাতায় আইডিবিআই আযোজিত ২১ কিমি ম্যারাথনে তৃতীয স্থান পেয়ে শচীন তেন্ডুলকারের হাত থেকে পুরস্কারের চেক গ্রহণ করেন হাসিবুল। এছাড়া স্থানীয়স্তরের ম্যারাথনগুলিতে বহুবার প্রথম হয়েছেন তিনি।

- Advertisement -

তবে আরও এগোনোর ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও আর্থিক সমস্যায থামতে হয়েছে তাঁকে। কলেজের দ্বিতীয বর্ষে পড়ার সময়ই আর্থিক অনটনে পড়াশোনায় ছেদ পড়ে। হাসিবুল বলেন, ‘প্র‌্যাকটিস করার জন্য প্রযোজনীয় পোশাক, জুতো কেনার খরচ অনেক। ভালো প্রশিক্ষকের তত্ত্বাবধানে নিয়মিত প্রশিক্ষণ নেওয়া দরকার। এসবের পিছনে যে খরচ তা জোটানোর মতো আর্থিক সংগতি আমার পরিবারের নেই। তাই এখন জমিতে চাষ-আবাদে বাবা ফজরুল হককে নিয়মিত সাহায্য করি।’ তবে এখনও অভ্যেসমতো সকালে উঠে দৌড় প্র‌্যাকটিস করেন হাসিবুল। স্থানীয়স্তরের ম্যারাথনগুলিতে অংশও নেন। তবে বড় কিছুর আর স্বপ্ন দেখেন না। হাসিবুলের মা হাসেনা বেগম বলেন, ছেলেটাকে নিযে একটা সময় অনেক স্বপ্ন দেখতাম। ভুলেই গিয়েছিলাম, আমাদের মতো গরিব মানুষের স্বপ্ন দেখতে নেই।

তথ্য ও ছবি- মোস্তাক মোরশেদ হোসেন