মার্কেট-আবাসনকে জায়গা ছেড়ে মেচির তীরে আশ্রয়

88

মহম্মদ হাসিম, খড়িবাড়ি : তরাই মানে তো সবুজ। সবুজের সমারোহ। কিন্তু কোথায় সবুজ? পানিট্যাঙ্কিতে এশিয়ান হাইওয়ে-২ ধরে এগোলে দুধার এখন ধূসর। সবুজ চা বাগানের স্থান নিয়েছে কংক্রিটের জঙ্গল। রাতে আলো ঝলমলে। এলাকাটিতে এখন বিত্তবানদের আমোদ-প্রমোদ, ব্যবসা-বাণিজ্যের নানা আয়োজন। বসবাসের জায়গা আবাসন। দেখে কে বলবে, এখানে একসময় দুটি পাতা, একটি কুঁড়ি তুলতেন চা শ্রমিকরা? ছিল শ্রমিক মহল্লাও। এক হাজারের বেশি শ্রমিক কাজ করতেন। তাঁরা আজও টিকে আছেন বটে। কিন্তু বৈভবের আড়ালে ঢাকা পড়ে আছে জীবনসংগ্রাম। আশ্রয়চ্যুত হয়েছেন বলা যাবে না। কর্মচ্যুতও হননি। কিন্তু বৈভব ও চাকচিক্য থেকে দূরে বেঁচে থাকার ন্যূনতম পরিকাঠামোর অভাবের মধ্যে জীবন তাঁদের।

এঁরা ছিলেন সতীশচন্দ্র চা বাগানের শ্রমিক। এখন কাজ করেন বাতাসি চা বাগানে। ভারত-নেপাল সীমান্তে মেচি নদীর তীরে তাঁদের মাথা গোঁজার ঠাঁইটি করে দিয়েছিলেন সতীশ চন্দ্র চা বাগানের কর্তৃপক্ষ। কিন্তু আর কোনও দায়িত্ব নেননি। না দিয়েছেন আর্থিক ক্ষতিপূরণ, না করেছেন থাকার জায়গায় পানীয় জল জোগানের বন্দোবস্ত। নেই  নিকাশিনালা। বাড়িতে বিদ্যুৎ সংযোগের তো প্রশ্নই ওঠে না। আলো, জলহীন অসহায় অবস্থায় থাকে ৪০-৫০টি পরিবার। সরকারি সমস্ত সুযোগসুবিধা থেকে বঞ্চিত এই শ্রমিক পরিবারগুলি। তাঁদের থাকার মূল জায়গায় এখন মার্কেট কমপ্লেক্স, ঝাঁ চকচকে আবাসন। চা বাগানের জমি হলেও হস্তান্তর করেছে সরকার। প্রথমে বামফ্রন্ট সরকার, পরে তৃণমূল সরকার।

- Advertisement -

স্থানীয় বাসিন্দা তথা সতীশ চন্দ্র চা বাগানের প্রাক্তন শ্রমিক বুধু খরিয়া বলেন, তুলে দেওয়ার পর আমাদের খোঁজখবর আর কেউ রাখে না। যে জায়গায় আমরা সকালে চা পাতা তুলতে যেতাম, সেখানে এখন তৈরি হচ্ছে বড় বড় কমপ্লেক্স। চোখের সামনে আমাদের ভাঙা টিনের বাড়ির সামনে তৈরি হচ্ছে বিশালাকায় বাড়িঘর। আমরা যে তিমিরে ছিলাম, সেই  তিমিরে পড়ে আছি।  মেচি নদীর সেতুর কাছে দাঁড়ালে চোখে পড়বে শ্রমিকদের বাড়িঘরগুলো। দুদিকে এসএসবি ক্যাম্প। রাস্তার ওপারে চা বাগানের সেই জমিতে মার্কেট কমপ্লেক্সের বিশাল ভবন।

২০০৬ সালে বামফ্রন্ট আমলে সতীশ চন্দ্র চা বাগানের ৬.৬ একর জমি বার্ষিক দেড় লক্ষ টাকা রাজস্বের বিনিময়ে পানিট্যাঙ্কি মার্কেট ডেভেলপমেন্ট কমিটি নামে একটি  সংস্থাকে লিজ দেওয়া হয়। একইভাবে তৃণমূল জমানায় ২০১৯ সালে লোকসভা নির্বাচনের পর বাগানের ৭.৯২ একর জমি মেচি মার্কেট ব্যবসাযী ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের হাতে তুলে দেওয়া হয় বলে স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ।

সেই থেকে মেচি নদীর তীরে উপেক্ষিত জীবন হাজারখানেক শ্রমিক পরিবারের। সেখানকার বাসিন্দা সুমারি খেরুয়া বলেন, দৈনিক ১৫০ টাকা হাজিরায় ৫ কিলোমিটার দূরে বাতাসি চা বাগানে আমাদের কাজ করতে যেতে হয়। এই হাজিরায় আমার ছজনের সংসার চালানো দুষ্কর। আবাসনগুলির জরাজীর্ণ অবস্থা। ঋণ নিয়ে বাড়িঘর মেরামত করব, সে উপায় নেই। বাগান কর্তৃপক্ষ অনুমতি দেয় না। ওরা অনুমতি না দিলে ব্যাংক ঋণ দেবে না। যত নিয়মকানুন শ্রমিকদের জন্য। অথচ বড়লোকরা অবাধে বাগানের জমি বেআইনিভাবে দখল করেছে।

৫ কিলোমিটার হেঁটে তবু এঁদের বাতাসি চা বাগানে গিয়ে রোজগারের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। অনেকের সেই ভাগ্যও হয়নি। যেমন প্রভু করুয়া। তিনি বলেন, সংসার চালানোর জন্য আমাদের আগের ঘরের জায়গায় নির্মিত মার্কেটে রাজমিস্ত্রির কাজ করছি। এমনই আরেকজন জুল্ফিনা করুয়া বলেন, বাগানের জমি কোটি কোটি টাকায় বিক্রি হয়েছে। কিন্তু আমাদের কপালে কিছুই জোটেনি। নানা সমস্যায় দিন কাটাচ্ছি। বর্ষাকালে অবস্থা আরও ভয়ংকর হয়ে ওঠে। মেচি নদীর জল উপচে শ্রমিক মহল্লায় ঢুকে থইথই অবস্থা হয়। জলনিকাশির কোনও বন্দোবস্ত নেই। পানীয় জলের জন্য একমাত্র ভরসা কুয়ো। অপরিস্রুত সেই জল পান করে অনেকে পেট ও চর্মরোগে ভোগেন।