প্রয়াণ দিবসে চাঁচলেই ব্রাত্য রসরাজ

156

বাপিকুমার দাস, চাঁচল : ঘরের ছেলে। তাই চিরঞ্জীবী। তিনি আজও বেঁচে আছেন সবার মনে, হাসিতে। তাঁর মৃত্যু নেই। তাই তাঁর প্রয়াণ দিবসেও তাঁকে মনে করে না চাঁচল। মৃত্যুবার্ষিকীতে জোটে না একথোকা ফুলও। এনিয়ে চাঁচল জুড়ে শুধুই মিলল মিশ্র প্রতিক্রিয়া।

বাংলা সাহিত্যের রসরাজ শিবরাম চক্রবর্তীর জন্মস্থান নিয়ে বিভিন্ন মত প্রচলিত রয়েছে। কারও মতে, তিনি ১৯০৩ সালের ১৩ ডিসেম্বর কলকাতায় মাসির বাড়িতে জন্মেছিলেন। আবার কেউ কেউ বলেন, ওই দিনেই তাঁর জন্ম হয়েছিল চাঁচলের পাহাড়পুরে। তবে তাঁর জন্মস্থান নিয়ে প্রথম মতের পক্ষেই বেশি প্রমাণ পাওয়া যায়। শিবরাম চক্রবর্তীর বাবা শিবপ্রসাদ চক্রবর্তী ছিলেন খেয়ালি মানুষ। বিষয়-সম্পত্তির খুব একটা ধার তিনি ধারতেন না। চাঁচলের রানি সিদ্ধেশ্বরীর ডাকে তিনি মুর্শিদাবাদের চোয়াগ্রাম থেকে চলে আসেন চাঁচলে। সেই সুবাদে শিবপ্রসাদবাবুর পরিবারও থিতু হয় চাঁচলে এসেই। তাই শিবরামের ছেলেবেলা কাটে চাঁচল রাজবাড়ির পিছনের দিকে মহাফেজখানার ঘরগুলিতে। পরবর্তীতে তিনি চাঁচল ছেড়ে পাড়ি দেন কলকাতায় এবং সেখানেই তিনি হয়ে ওঠেন বাংলা সাহিত্যের এক দিক্পাল। বাঙালি আজও মানে, বাংলা সাহিত্যে তাঁর মতো হাস্যরসের আমদানি করতে পারেননি কেউই।

১৯৮০ সালের ২৮ অগাস্ট কলকাতায় মৃত্যু হয় শিবরাম চক্রবর্তীর। শেষ জীবন তাঁর প্রায় অর্ধাহার ও অনাহারে কাটলেও শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তিনি মানুষের মুখে ফুটিয়ে গিয়েছিলেন অনাবিল হাসি। আর সেক্ষেত্রে অবশ্যি তাঁর অস্ত্র ছিল কলম এবং তাঁর সহজাত হাস্যরস। বুধবার ছিল সেই শিবরামেরই মৃত্যুদিবস। কিন্তু গোটা চাঁচলের কোথাও কোনো দুঃখপ্রকাশ নেই। কেন? উত্তর দিতে গিয়ে চাঁচল সিদ্ধেশ্বরী ইন্সটিটিউশনের (সেখানেই রয়েছে শিবরামের আবক্ষ মূর্তি) প্রধান শিক্ষক আসরারুল হক বলেন, আমরা প্রতি বছরই শিবরাম চক্রবর্তীর জন্মদিন পালন করি। কিন্তু মৃত্যুদিন কখনোই না। শিবরাম চক্রবর্তী ছিলেন এই স্কুলেরই ছাত্র। তিনি এই স্কুলের সন্তান। এক সন্তানের মৃত্যুদিন মা কীভাবে পালন করবে! তবে তিনি আজও এলাকাবাসীর মনের গভীরেই রয়েছেন। সেই আসন থেকে তাঁকে কেউ নড়াতে পারবে না। তিনি চাঁচলের গর্ব। চাঁচলের আত্মাও বটে।

যদিও মৃত্যুদিনেও সাহিত্যিকের প্রতি সিদ্ধেশ্বরী ইন্সটিটিউশনের এই অনীহা ভালো চোখে দেখছেন না চাঁচলের শিবরাম অনুগামীদের একাংশ। এলাকার বাসিন্দা তথা চাঁচল মহকুমা আদালতের আইনজীবী সুবেশ মিত্র নিজেও একজন শিবরাম অনুরাগী। তিনি বলেন, শিবরামের জন্মভিটেতেই তাঁর জন্ম ও মৃত্যুদিন পালিত হয় না। সিদ্ধেশ্বরী ইন্সটিটিউশন প্রখ্যাত এই সাহিত্যিকের জন্মদিনে নমো নমঃ করে তাঁর মূর্তিতে মালা দিলেও মৃত্যুদিনে সেই মূর্তিতে একটি ফুলও দেয় না। অথচ শিবরাম চক্রবর্তীর জন্যই আজ চাঁচলকে বিশ্ববাসী চেনে। তাঁদের দুঃখ, নিজের জন্মভিটেতেই ব্রাত্য বাংলার এই রস সাহিত্যিক।