চাকরি পাওয়ার আশায় ফুটবল ছাড়েননি শুভম

57

নৃসিংহপ্রসাদ গঙ্গোপাধ্যায়, কুমারগ্রাম : পড়াশোনা নয়, খেলাধুলো করে যে, গাড়িঘোড়া চড়ে সে, এই আশায় এখনও ফুটবলে মনপ্রাণ সঁপে রেখেছেন শুভম বড়াল। ভালো ফুটবল খেলার সুবাদে একদিন স্পোর্টস কোটায় ঠিক চাকরি জুটে যাবে, এটাই তাঁর আশা। এই আশায় বুক বেঁধে বছরভর ফুটবল অনুশীলন চালিয়ে যাচ্ছেন শিক্ষিত বেকার যুবক শুভম।

ইন্দো-ভুটান সীমান্তের প্রত্যন্ত কুমারগ্রাম বনবস্তির দরিদ্র পরিবারের ছেলে শুভম। কুমারগ্রাম মদনসিং হাইস্কুল থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাশ করেও শুধুমাত্র অর্থাভাবের কারণে কলেজে পা রাখতে পারেননি তিনি। এনিয়ে শুভম এবং তাঁর বাবা-মায়ের আক্ষেপের শেষ নেই। পরিবারের অভাব-অনটন শুভমের উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়ালেও স্পোর্টস কোটায় চাকরি লাভের আশায় ফুটবল খেলা ছাড়েননি তিনি। খরস্রোতা নদী, পাহাড়, জঙ্গল ঘেরা বনবস্তির একফালি ফাঁকা জায়গায় প্রত্যেক দিন ফুটবল নিয়ে অনুশীলন চালিয়ে যাচ্ছেন।

- Advertisement -

স্কুল গেমস ফেডারেশন অফ ইন্ডিয়ার উদ্যোগে আয়োজিত জাতীয় স্তরের ফুটবল প্রতিযোগিতায় নজরকাড়া খেলার সুবাদে প্রচুর প্রশংসা কুড়িয়েছেন শুভম। কিন্তু কুমারগ্রাম বনবস্তির হতদরিদ্র পরিবারের ওই সন্তানের কপালে চাকরি জোটেনি। ২০১৮ সালে ৬৪তম ন্যাশনাল স্কুল গেমস অনুষ্ঠিত হয়েছিল রাজস্থানের পাচেরিবাড়ি ঝুনঝুনু জেলায়। ভালো খেলার সুবাদে অনূর্ধ্ব-১৯ ফুটবলে প্রথমে জেলা এবং পরবর্তীতে রাজ্য দলে জায়গা করে নেন শুভম। পশ্চিমবঙ্গের হয়ে ভালো খেলে কোচ, স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষিকা এবং সহপাঠীদের প্রশংসাও কুড়োন তিনি। শুভমের আক্ষেপ, জেলা এবং রাজ্য দলের হয়ে ভালো ফুটবল খেলেও কোনওরকম সরকারি সুযোগসুবিধা পাচ্ছি না। সহপাঠীদের অনেকেই খেলাধুলোর সুবাদে সরকারি চাকরি করছে। তাই স্পোর্টস কোটায় চাকরির আশায় এখনও অনুশীলন চালিয়ে যাচ্ছি।

লিওনেল মেসি এবং ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডোর ভক্ত শুভম অকপটে বলেন, বছরদুয়েক আগেও একজন সফল ফুটবলার হওয়ার স্বপ্ন দেখতাম। পরিবারের আর্থিক অভাব-অনটন স্বপ্নপূরণে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। টাকার অভাবে বন্ধ হয়ে গিয়েছে লেখাপড়াও। কুমারগ্রাম মদনসিং হাইস্কুল থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাশ করলেও কলেজে আর ভর্তি হতে পারিনি। বাড়িতে প্রতিদিনই নুন আনতে পান্তা ফুরায়। সংসারের হাল ধরতে স্পোর্টস কোটায় একটা সরকারি চাকরির আশায় দিন গুনছি। বাড়িতে বাবা, মা এবং ছোট বোন রয়েছে। বনবস্তির জীবনযাত্রা অত্যন্ত কঠিন। রাস্তাঘাট নেই। যাতায়াতে সমস্যা রয়েছে। গাড়ি ঢোকে না। তবুও ছোট বোন জঙ্গলের মধ্য দিয়ে গিয়ে হাইস্কুলে পড়াশোনা করছে। টাকাপয়সা উপার্জন করতে না পারলে ছোট বোনের লেখাপড়াও মাঝপথে বন্ধ হয়ে যাবে।

শুভমের বাবা, পেশায় দিনমজুর, ৬৫ বছরের ধনবাহাদুর বড়াল বলেন, ভুটানে কাজ করতাম। করোনার জেরে সীমান্ত বন্ধ থাকায় সেই কাজ হারিয়েছি। নিজের গ্রামেই এখন দিনমজুরি করছি। পাশাপাশি পশুপালনও করছি। বয়সের ভারে আগের মতো ভারী কাজ করতে পারি না। যা সামান্য উপার্জন হয় সেটা দিয়ে কোনওরকমে সংসার চালাই। শুভম ভালো ফুটবল খেলে। স্কুল থেকে ওকে কলকাতা, রাজস্থান সহ বিভিন্ন জায়গায় খেলতে নিয়ে গিয়েছিল। ভেবেছিলাম ফুটবল খেলেই শুভমের একটা হিল্লে হয়ে যাবে। কিন্তু ছেলের কর্মসংস্থান না হওয়ায় প্রচণ্ড দুশ্চিন্তায় আছি।

মদনসিং হাইস্কুলের গেম টিচার কৌশিক রায় বলেন, ওয়েস্টবেঙ্গল স্টেট কাউন্সিল ফর স্কুল গেমস অ্যান্ড স্পোর্টসের অনূর্ধ্ব-১৯ আন্তঃজেলা ফুটবল প্রতিযোগিতায় ভালো খেলার সুবাদে রাজ্য দলে ঠাঁই পেয়েছিল শুভম। উলুবেড়িয়াতে কোচিং ক্যাম্পে থাকাকালীন সে নিজের যোগ্যতার প্রমাণ দিয়েছিল। ৬৪তম ন্যাশনাল স্কুল গেমসে পশ্চিমবঙ্গ রানার্স হয়। সেখানে শুভম সবার নজর কেড়েছিল। ছেলেটির কর্মসংস্থান হলে প্রত্যন্ত গ্রামগঞ্জের ছেলেমেয়েরা খেলাধুলোর প্রতি আরও উৎসাহী হবে।