দার্জিলিং জেলার সমতলের কোনও আসনই নিশ্চিত নয় তৃণমূল-বিজেপির

774

শিলিগুড়ি ব্যুরো : শেষ কথাটা সবার আগে লিখে ফেলা যাক। পাহাড় আর সমতল মিলিয়ে দার্জিলিং জেলায় ভোটের জটিল অঙ্ক গত চার দশক ধরে কোনও দল মেলাতে পারেনি। আর তাই এই জেলার একচ্ছত্র রাজনৈতিক দখল কোনও দলের হাতে যায়নি। পাহাড় তাদের স্থানীয় নেতার বশংবদ হয়ে থেকেছে। সেই নেতার মাথায় হাত বুলিয়ে যে দল তাঁকে ম্যানেজ করতে পেরেছে পাহাড়ের লোকসভা আসন সেই দলের হয়েছে। স্থানীয় দল বিধানসভা আসন, জিটিএ সব একতরফা দখল করেছে। পাশাপাশি সমতলে উন্নয়নের অঙ্কে ভোট হয়নি। বরং শিলিগুড়ি মহকুমা অনেকটাই প্রতিষ্ঠানবিরোধী মনোভাব নিয়ে গত এক দশক ধরে রাজ্যের শাসকদলের বিরোধিতা করছে। ফলে ২০২১ সালের ভোটে শিলিগুড়ি সমতলে কী হবে, তা নিয়ে তৃণমূল, বিজেপির মতোই বাম-কংগ্রেসও চিন্তায় রয়েছে। কারণ গোটা রাজ্যে এই জায়গাটুকুতেই তাদের ভালো কিছু করার সম্ভাবনা রয়েছে।

সব রাজনৈতিক দল কিন্তু একটা কথা জানে- শিলিগুড়ি সমতলসমেত গোটা দার্জিলিং জেলায় উন্নয়নের অঙ্কে ভোট হয় না। তাই যদি হত তাহলে পাহাড় বিজেপির সাংসদকে জিতিয়ে আনত না, ২০১১ সালের ভোটে শিলিগুড়ি বিধানসভা আসনে অশোক ভট্টাচার্য হারতেন না। এখানে ভোট হয় কিছুটা হুজুগে আর কিছুটা ব্যক্তিপুজোয়। ২০১১ সালের বিধানসভা ভোটে মমতা ঝড়ে রুদ্রনাথ ভট্টাচার্যের মতো আনকোরা তৃণমূল প্রার্থীর কাছে উড়ে যাওয়ার পরেও অশোকবাবু শিলিগুড়ির অভিভাবক হিসাবে নিজের ইমেজ ধরে রেখেছিলেন। আর তাই তিনি ২০১৬ বিধানসভা নির্বাচনে আবার জিতে ফিরে এসেছিলেন প্রবলভাবে। অন্যদিকে, ২০১১ সালে তৃণমূলকে জিতিয়ে আনার পরেও শিলিগুড়ি কিন্তু সেভাবে উন্নয়নের ছোঁয়া পায়নি। সেই সময় প্রত্যাশা পূরণে রুদ্রনাথ ভট্টাচার্য-গৌতম দেবদের ব্যর্থতাই এই শহরকে অনেকটা তৃণমূলবিরোধী করে তুলেছিল। সেইসঙ্গে পুরনিগমের অঙ্কও কাজ করেছে। শিলিগুড়ি শহর এলাকা কোনওদিনই তৃণমূলকে একতরফা সায় দেয়নি। মেয়র হওয়ার আশা পূরণ না হওয়ায় জেলা তৃণমূলের সর্বেসর্বা এবং মন্ত্রী থেকেও এই শহরের জন্য গৌতমবাবু সেই অর্থে কিছু করেননি। শিলিগুড়ি শহর যে তাঁর প্রতি বিশ্বস্ত নয়, এটা গৌতমবাবু নিজেও জানেন। আর তাই তিনি শিলিগুড়ি বিধানসভা আসনে কোনওদিন দাঁড়াননি।

- Advertisement -

২০২১ সালে নির্বাচনের অঙ্ক আরও জটিল হয়েছে, বিধানসভা ভোটের পাশাপাশি শিলিগুড়ি পুরনিগমের ভোট এসে পড়ায়। শহরের মানুষ একটা পুরোনো প্রশ্ন তুলছেন- গত ১০ বছরে এই শহরের জন্য রাজ্য সরকার কী করেছে? বাম আমলে তো তবু একটা উড়ালপুল, শহরের পাশে বাইপাস রাস্তা, তেনজিং নোরগে ও পি সি মিত্তাল বাস টার্মিনাসের মতো কিছু কাজ হয়েছিল। কিন্তু শিলিগুড়ি পুরনিগম তো বটেই, এমনকি মহকুমা পরিষদেও হেরে গিয়ে রাজ্যের শাসকদল শিলিগুড়ি সমতলের সঙ্গে বিমাতৃসুলভ আচরণই করেছে। এজন্য কিন্তু তৃণমূলের সমতলের নেতারা কোনওভাবেই দায় এড়াতে পারেন না। শিলিগুড়ির পাশে থাকার বার্তা দেওয়া যে জরুরি, এটা তৃণমূল নেত্রীকে বোঝাতে পুরোপুরি ব্যর্থ। আসলে শিলিগুড়ির আর্থিক সচ্ছলতার জন্যই এখানে পার্টির পদাধিকারী হওয়া অত্যন্ত লোভনীয়। আর শিলিগুড়ির তৃণমূল নেতারা সেই ক্ষমতার রাশ মুঠোয় নিতে এত ব্যস্ত যে, স্থানীয় উন্নয়ন, জনসংযোগের মতো রাজনীতির প্রাথমিক শর্তগুলোও তাঁরা ভুলে গিয়েছেন।

তৃণমূল নেতাদের পদের জন্য এই কোন্দলের সুযোগটা গত পাঁচ বছর ধরে নিয়েছেন পোড়খাওয়া অশোক ভট্টাচার্য। পুরনিগমের কাজ না করার যাবতীয় দায় তিনি রাজ্য সরকারের কাঁধে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। রাজ্য সরকার টাকা না দিয়ে বঞ্চনা করছে, এই কথাটা তিনি শিলিগুড়ির মানুষকে বোঝাতে অনেকটাই সক্ষম। আর শিলিগুড়িতে দ্বিতীয় জলপ্রকল্পের অনুমোদন না দেওয়ার মতো সিদ্ধান্ত নিয়ে রাজ্য সরকার সেই ধারণা জোরদার করেছে। জলসংকট থেকে শুরু করে শিলিগুড়ি শহরে গলির ভাঙাচোরা রাস্তা- সব ভোগান্তি যে আর্থিক কারণে আর তা রাজ্য সরকার টাকা না দেওয়ার জন্যই হয়েছে, এটা ফাটা রেকর্ডের মতো বাজিয়ে চলেছেন অশোকবাবু। দেরিতে হলেও মুখ্যমন্ত্রী অশোকবাবুর এই চাল বুঝতে পেরেছেন। সম্প্রতি উত্তরকন্যার প্রশাসনিক বৈঠকে তিনি এজন্যই অশোকবাবুকে ডেকেছিলেন। শুনতে চেয়েছিলেন পুরনিগমের অভাব-অভিযোগের কথা। অশোকবাবু ভোট পর্যন্ত বঞ্চনার রেকর্ড বাজাবেন বলেই কিন্তু মুখ্যমন্ত্রীর বৈঠকে যাননি। বরং আলাদা করে শিলিগুড়ির উন্নয়নের কথা শুনতে হবে, এমন দাবি তুলে বৈঠক এড়িয়েছেন। অন্যদিকে, পুরনিগমে বারবার হুংকার দিয়ে অশোকবাবুদের বোর্ডের বিরুদ্ধে অনাস্থা আনতে পারেননি গৌতম দেবরা। জেলায় তৃণমূলের রাজনৈতিক দৈন্যদশাটা এতে আরও স্পষ্ট হয়েছে শিলিগুড়ির মানুষের কাছে। আর এটাই অশোকবাবু তথা সিপিএমের টিআরপি বাড়িয়েছে। মনে রাখতে হবে, শিলিগুড়ি পুরনিগমের ভোটও একই সঙ্গে এসে পড়ায় বিধানসভা নির্বাচনে তার ভালো প্রভাব থাকবে। পুর এলাকার চাওয়া-পাওয়ার অঙ্কের হিসাবও ভোটাররা গৌতমবাবুর কথায় ইঞ্চিতে ইঞ্চিতে বুঝে নেবেন।

কিন্তু এর বাইরে একটা রাজনৈতিক মেঘ শিলিগুড়ির আকাশে ঘনিয়েছে। গত লোকসভা ভোটে শিলিগুড়ি মহকুমার সব আসনেই বিজেপির ভোট অস্বাভাবিক হারে বেড়েছিল। এমনিতেই শিলিগুড়িতে ভোটারদের জাতিবিন্যাস কিছুটা অদ্ভুত। এখানে ভূমিপুত্র রাজবংশীদের পাশাপাশি বাংলাদেশ থেকে আসা উদ্বাস্তুরা রয়েছেন। আবার বিহার বা অন্য রাজ্য থেকে আসা নিম্নবিত্ত মানুষের পাশাপাশি অবাঙালি ব্যবসায়ীরা রয়েছেন। এই ব্যবসায়ীরা অত্যন্ত বিত্তশালী হওয়ায় তাঁরা শহরকে অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ করেন। এতদিন এই ব্যবসায়ী সম্প্রদায় অশোকবাবুর অত্যন্ত সুহৃদ থাকলেও সেই অঙ্ক কিন্তু অনেকটা বদলেছে গত কয়েক বছরে। অবাঙালি এই ভোটব্যাংক বিজেপির দিকে কতটা ঝুঁকে পড়েছে তা রামনবমীর দিন শহরে বের হলেই টের পাওয়া যায়। অশোকবাবু-গৌতমবাবুরা যদি সেই দেওয়াল লিখন পড়তে না পারেন তাহলে কিন্তু আগামীদিনে বিপদ আরও বাড়বে। বিজেপির ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সমস্যা হল, এই পড়ে পাওয়া চোদ্দো আনা ভোটকে  নিজেদের স্থায়ী ভোটব্যাংক করে তোলার  মতো নেতা বা সংগঠন তাদের নেই। অভিজিৎ রায়চৌধুরীর মৃত্যুর পর জেলায় তাদের নেতত্বে আরও আকাল চলছে। বিজেপির এক নীচুতলার কর্মী আক্ষেপ করছিলেন, সিপিএম বা তৃণমূলের একজন কাউন্সলিারকে শহরের যত লোক চেনেন, আমাদের জেলা সভাপতিকে তত লোক চেনেন না। এই আক্ষেপ কিন্তু বিজেপির কাছে বড় একটা সমস্যা। ফলে শিলিগুড়ি শহর তো বটেই, মহকুমায় তারা সাংগঠনিকভাবে কতটা ভোট করাতে পারবে তা নিয়ে সংশয় আছে।  এখানে একটা কথা বলে নেওয়া যাক- শিলিগুড়ি পুরনিগমের সংযোজিত এলাকার ১৪টি ওয়ার্ড ডাবগ্রাম-ফুলবাড়ি বিধানসভার অংশ। ফলে পুরনিগমের ভোটে তাদের মতামত জানানোর সুযোগ থাকলেও শিলিগুড়ি বিধানসভা ভোটে তাঁদের কিছু করার নেই।

এবার শিলিগুড়ির মহকুমার দুটি আসনের দিকে তাকানো যাক। নকশালবাড়ি-মাটিগাড়ার দুটো টার্মের বিধায়ক শংকর মালাকার প্রায় ২৫ বছর ধরে জেলা কংগ্রেস সভাপতি। কংগ্রেসের কর্মীদের একাংশ তো বটেই, এমনকি তাঁর বিধানসভা এলাকার ভোটাররাও বলেন, শিলিগুড়ি পুরনিগমে অশোকবাবুদের বোর্ড বাঁচাতে তিনি যতটা সক্রিয় তার অর্ধেকও যদি তিনি নিজের বিধানসভা কেন্দ্রে দেখাতেন তাহলে মাটিগাড়া-নকশালবাড়ির চেহারা বদলে যেত। গোটা বিধানসভা এলাকায় রাস্তাঘাট, ছোট সেতু-কালভার্ট, বাজারহাটের চেহারা দেখলেই বোঝা যায়, এই অভিযোগ কতটা সত্যি। এমনিতেই রাজ্যের শাসকদলের হাতে নয় বলে এই এলাকায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ে সরকার সেভাবে নজর দেয়নি। তার ওপর বিধায়কের জন্য ন্যূনতম পরিষেবাটুকুও অনেক জায়গার মানুষ পান না। আগামী ভোটে তার একটা বড় ধাক্কা শংকরবাবুকে ধরাশায়ী করতে পারে। একইভাবে ফাঁসিদেওয়া আসনে ছোটন কিসকুকে দলে টেনেও তৃণমূল কিন্তু এই এলাকার ভোটারদের মন জয় করতে পারেনি। অথচ রাজ্যের আর পাঁচটা জায়গার মতোই শিলিগুড়ি সমতলে কন্যাশ্রী, রূপশ্রী, সবুজ সাথীর মতো প্রকল্পগুলি রূপায়িত হয়েছে। বহু মানুষ বাংলা আবাস যোজনার ঘর পেয়েছেন। তাহলে সমস্যাটা কোথায়? মহকুমার গ্রামের পথে বা জাতীয় সড়ক ধরে হাঁটলেই সেই কথা পরিষ্কার হয়ে যায়। নদী থেকে বালি-পাথর তোলার অবৈধ কারবার, সরকারি ও ব্যক্তিগত জমি দখল, সিন্ডিকেটরাজ, ঔদ্ধত্য, সরকারি প্রকল্পের সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার নামে কাটমানি খাওয়া, চা বাগানের র‌্যাশন নিয়ে সীমাহীন দুর্নীতি- কোন অভিযোগ যে তৃণমূল নেতাদের নামে নেই, সেটা খুঁজে বের করাই মুশকিল। নেতারা বোঝেন না, ভোট দেওয়ার সুযোগ পেলে সাধারণ মানুষ সুদে-আসলে তা উশুল করে নেবেন। গত পঞ্চায়েত ভোটের মতো ভোট করাতে না পারলে তাই মহকুমার তিনটি আসনই তৃণমূলের শক্ত গেরো। আমাদের সমীক্ষা বলছে, শিলিগুড়ি মহকুমার সংখ্যালঘু ও রাজবংশী ভোট অনেকটাই নির্ণায়ক শক্তি। সংখ্যালঘু ভোট একচেটিয়া বামেদের থাকলেও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্যই তাতে তৃণমূল ভাগ বসাতে পারবে। রাজবংশী ভোট কারও দিকেই পুরোপুরি যাবে না। ফলে বাম-কংগ্রেস জোট বা তৃণমূলের কাছে মহকুমার গ্রাম এলাকার দুটি আসন লড়াইয়ে জায়গা। শহরে সেই লড়াইয়ে বিজেপিও থাকবে।