ই-টেন্ডার এড়াতে ছোট ছোট কাজ কোচবিহারে

চাঁদকুমার বড়াল, কোচবিহার : কোচবিহারে ই-টেন্ডার এড়াতে পঞ্চায়েতে বড় কাজকে ছোট ছোট কাজে ভাগ করে বরাত দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠছে। দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দিতেই এই কাজ করা হচ্ছে বলে বিরোধীদের অভিযোগ। ছোট ছোট কাজের বিষয়টিকে মেনে নিলেও দুর্নীতির অভিযোগ অস্বীকার করেছে তৃণমূল। আবার নিয়ম মেনে কাজ না করায় কোচবিহারের বেশ কয়েকটি পঞ্চায়েত চতুর্থ রাজ্য অর্থ কমিশনের টাকা পায়নি। পাশাপাশি জেলার পঞ্চায়েতগুলোকে চতুর্দশ অর্থ কমিশনের দেওয়া ১৬০ কোটি টাকার মধ্যে ৩৭ কোটি টাকা এখনও পড়ে রয়েছে।

কোচবিহার জেলায় ১২৮টি গ্রাম পঞ্চায়েত রয়েছে। এর মধ্যে ৩০টি গ্রাম পঞ্চায়েত ২০১৮-১৯ আর্থিক বর্ষে নিয়ম মতো কাজ না করায় আইএসজিপি ও চতুর্থ রাজ্য অর্থ কমিশনের টাকা পায়নি। পাশাপাশি ২০১৯-২০ আর্থিক বর্ষে কোচবিহার জেলার ১২৮টি গ্রাম পঞ্চায়েত চতুর্দশ কেন্দ্রীয় অর্থ কমিশন, আইএসজিপি এবং চতুর্থ রাজ্য অর্থ কমিশন মিলে ১৬০ কোটি ৫৭ লক্ষ টাকা পেয়েছে। গড়ে একটি গ্রাম পঞ্চায়েত ১ কোটি ২৫ লক্ষ করে পেয়েছে। বছর শেষ হয়ে প্রায় তিন মাস পেরিয়ে গেলেও এখনও প্রায় ৩৭ কোটি টাকা পড়ে রয়েছে গ্রাম পঞ্চায়েতগুলোর কাছে। যে টাকা তারা এখনও খরচ করতে পারেনি। জেলায় বেশিরভাগ পঞ্চায়েতেই ই-টেন্ডার এড়িয়ে কাজ হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ২০১৪ সালে রাজ্য সরকার নির্দেশ দিয়েছে, পাঁচ লক্ষ টাকার বেশি কাজ হলে তাতে ই-টেন্ডার করতে হবে। অথচ দেখা যাচ্ছে, এক লক্ষ থেকে সাড়ে তিন লক্ষ টাকার মধ্যে স্কিম করে ছোট ছোট কাজ করা হচ্ছে।

- Advertisement -

এর ফলে ই-টেন্ডারও করতে হচ্ছে না। জেলায় প্ল্যান নিয়ে এসে কোনও অ্যাসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার পদমর্যাদার কাউকে দিয়ে ভেটিংও করতে হচ্ছে না। সবটাই গ্রাম পঞ্চায়েতের মধ্যে হয়ে যাচ্ছে। একটি বড় রাস্তা না করে, ভাগ ভাগ করে তা করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এতে বড় স্কিম করতে হচ্ছে না। ৫ লক্ষ টাকার নীচেই হয়ে যাচ্ছে। কোচবিহারের বেশ কয়েকটি গ্রাম পঞ্চায়েতে খোঁজ নিয়ে দেখা গিয়েছে, পাঁচ লক্ষ টাকার নীচে অনেক কাজ হয়েছে এবং সেইসব কাজের বেশিরভাগই ছোট রাস্তা তৈরি। জামালদহ গ্রাম পঞ্চায়েতে ২০১৯-২০ আর্থিক বর্ষের টাকায় ১৬টি ছোট রাস্তা করা হবে। সবই ৩ লক্ষ ৫০ হাজার টাকার মধ্যে বলে জানা গিয়েছে। এই কাজের ওয়ার্ক অর্ডার শীঘ্রই দেওয়া হবে। জামালদহ গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রধান দীপা বর্মন বলেন, গত আর্থিক বছরে আমরা বড় রাস্তা করেছি। এবার ছোট রাস্তা করছি। এলাকার প্রয়োজনেই এই কাজ করা হচ্ছে।

মাথাভাঙ্গা-২ ব্লকের আঙ্গরাকাটা পাড়াডুবি গ্রাম পঞ্চায়েতে ২০টি কংক্রিটের রাস্তা হচ্ছে। এখানে আবার ই-টেন্ডার, ম্যানুয়াল মিলে কাজ করানো হচ্ছে। ৩ লক্ষ ৫০ হাজার থেকে ৬ লক্ষ টাকা পর্যন্ত রাস্তার কাজ হচ্ছে। এই গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রধান অশোক বর্মনের দাবি, তাঁরা সঠিকভাবেই কাজ করছেন। দিনহাটা-১ ব্লকের ভিলেজ-২ গ্রাম পঞ্চায়েত প্রধান জয়ন্তকুমার দাস বলেন, ২০১৭-১৮ এবং ২০১৯-২০ আর্থিক বর্ষ মিলে ৪৭টি ছোট রাস্তা করেছি। সবই পাঁচ লক্ষ টাকার নীচে কাজ। বড় কাজ হলে সবাই কাজ পাবেন না। তাই ছোট কাজ বেশি করা হয়। বিজেপির জেলা সভানেত্রী মালতী রাভা বলেন, তৃণমূল উপর থেকে নীচ পর্যন্ত দুর্নীতিতে ভরা। কাছের মানুষকে কাজ পাইয়ে দিতে দুর্নীতি করতে ই-টেন্ডার করা হচ্ছে না। কোনও স্থায়ী সম্পদ তৈরি হচ্ছে না। একশো দিনের কাজেও ব্যাপক দুর্নীতি হচ্ছে। সিপিএমের জেলা সম্পাদক অনন্ত রায় বলেন, কাটমানি খাওয়ার জন্যই ছোট কাজ বেশি করা হচ্ছে।

অভিযোগ অস্বীকার করে উত্তরবঙ্গ উন্নয়নমন্ত্রী রবীন্দ্রনাথ ঘোষ বলেন, বিরোধীদের ভিত্তিহীন অভিযোগ। গ্রাম পঞ্চায়েত তো ছোট কাজই করবে। বড় কাজ করার জন্য জেলা পরিষদ, পঞ্চায়েত সমিতি, অন্য দপ্তর আছে। গ্রাম পঞ্চায়েতে তো ইঞ্জিনিয়ার নেই যে বড় কাজ হবে। ছোট রাস্তা হলেও কাজ তো হচ্ছে। পঞ্চায়েতে টাকা ফেরত যায় না বলেও দাবি মন্ত্রীর। কোচবিহারের অতিরিক্ত জেলা শাসক (পঞ্চায়েত) রামকৃষ্ণ মালি বলেন, জেলায় সব পঞ্চায়েতে নিয়ম মেনেই কাজ হচ্ছে। পঞ্চায়েতে বড়-ছোট সব ধরনের কাজই হয়। শর্ত পূরণ না করায় কিছু পঞ্চায়েত এই অর্থবর্ষে টাকা পায়নি। তার মানে এই নয়, ওই পঞ্চায়েতগুলিতে কোনও কাজ হয়নি।