অরুণ ঝা, চোপড়া : বালি মাফিয়ার রেশ কাটতে না কাটতেই পুলিশ ও রাজনৈতিক দাদাদের ছত্রছায়ায় মাটি মাফিয়ার দাপটে চোপড়ার ক্ষুদ্র চা চাষিরা সংকটে পড়েছেন। আগ্নেয়াস্ত্রের ভয় এবং মাটি মাফিয়াদের চোখরাঙানির জেরে একরের পর একর চা বাগান কার্যত ধ্বংসের মুখে এগিয়ে চলেছে। পুলিশে লিখিত অভিযোগ জানিয়ে লাভ হচ্ছে না বলে অভিযোগ। যেভাবে ব্যারং নদীর ধার থেকে চা বাগান ঘেঁষে অবাধে মাটি কাটা হচ্ছে তাতে আগামী বর্ষায় একরের পর একর চা বাগান নদীগর্ভে চলে যেতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন খোদ চোপড়ার বিধায়ক হামিদুল রহমান। তবে তিনি রাজনৈতিক মদতের কথা অস্বীকার করেছেন। নর্থবেঙ্গল স্মল টি প্ল্যান্টার্স অ্যাসোসিয়েশন গোটা ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। মহকুমা ভূমি ও ভূমিসংস্কার দপ্তর বিষয়টি ব্লক ভূমি ও ভূমিসংস্কার দপ্তরের ঘাড়ে চাপিয়েছে। চোপড়া ব্লক ভূমিসংস্কার আধিকারিক দীপেন লামাকে এ ব্যাপারে বারবার ফোন করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। চোপড়া থানার পুলিশ বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার মরিয়া চেষ্টা চালিয়েছে।

ইসলামপুরে ৩১ নম্বর জাতীয় সড়কের বাইপাস রাস্তার কাজ চলছে। এজন্য প্রচুর মাটির প্রয়োজন। চোপড়ার ভৈষভিটা এলাকায় চা বাগান লাগোয়া নীচু জমি থেকে অবাধে মাটি কাটার কাজ চলছে। অন্তর্তদন্তে জানা গিয়েছে, চা বাগান মালিকদের একাংশ নিজেদের জমি থেকে মাটি কাটার জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকার লেনদেন করেছেন। কিন্তু সেই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে মাটি মাফিয়ারা তার বাইরেও অবৈজ্ঞানিকভাবে মাটি কাটছে। ফলে অন্য চা বাগানগুলির অস্তিত্ব সংকটের মুখে পড়েছে। আরও জানা গিয়েছে, ভূমিসংস্কার দপ্তরের একাংশের যোগসাজশে সরকারি রয়্যালটি ফাঁকি দিয়ে এই কারবার চলছে। চোপড়া ভূমিসংস্কার দপ্তর দুষ্কৃতীদের আগ্নেয়াস্ত্রের তাণ্ডবে কয়েক মাস আগে বন্ধ হতে বসেছিল। উত্তরবঙ্গ সংবাদ-এ খবরটি প্রকাশিত হতেই প্রশাসন নড়েচড়ে বসে।

ভূমিসংস্কার দপ্তর সূত্রেই জানা গিয়েছে, চলতি মাসের ১৪ তারিখ সংশ্লিষ্ট দপ্তরের জেলাস্তরের শীর্ষ কর্তারা নীচুতলার সমস্ত আধিকারিককে নিয়ে বৈঠকে বসেছিলেন। সেই বৈঠকে আগামী তিনমাসের মধ্যে উত্তর দিনাজপুর জেলা থেকে ১৫ কোটি টাকা রয়্যালটি আদায়ে টার্গেট নেওয়া হয়েছে। এরমধ্যে চোপড়া ভূমিসংস্কার দপ্তরের টার্গেট ১ কোটি টাকারও বেশি। অভিযান চালানোর জন্য সমস্ত ব্লক ভূমিসংস্কার আধিকারিককে আগামী তিনমাসের জন্য রোজ ১০০০ টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। ফলে এতকিছুর মধ্যেও চোপড়ায় মাটি মাফিয়াদের দাপট কীভাবে কায়েম রয়েছে তা নিয়ে স্বভাবতই জল্পনা তুঙ্গে। এদিকে, ভয়ে চা বাগান মালিকরা কেউই মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছেন না। তাঁরা জানিয়েছেন, মুখ খুললেই হয় গুলি খেতে হবে অথবা বাগানে ঢোকা বন্ধ হয়ে যাবে।

একমাস আগে চোপড়া থানায় এক চা বাগানের মালিক এই মর্মে এফআইআর দায়ে করলেও পুলিশ পদক্ষেপ করেনি। এছাড়া, রাজনৈতিক দাদাদের কাছে দরবার করেও সুফল মেলেনি বলে অভিযোগ। ফলে ক্ষুদ্র বাগান মালিকরাও রীতিমতো আতঙ্কে রয়েছেন। চোপড়া থানার আইসি বিনোদ গজমের বলেন, এধরনের কোনো ঘটনা ঘটেছে বলে আমার জানা নেই। থানায় কেউ লিখিত অভিযোগ করেনি। তবে এফআইআরের তারিখ এবং থানায় তা রিসিভ করার কথা বলতেই আইসির সুর বদলে যায়। তিনি বলেন, তাহলে হয়তো থানার অন্য অফিসাররা আমাকে বিষয়টি জানাননি। আমি খোঁজ নিয়ে দেখছি। ইসলামপুর মহকুমা ভূমি ও ভূমিসংস্কার আধিকারিক থমাস নামচিও বলেন, চোপড়া ভূমিসংস্কার দপ্তরের বিষয়টি দেখার কথা। প্রয়োজন অনুসারে আমি যথাযথ পদক্ষেপ করব।

নথবেঙ্গল স্মল টি প্ল্যান্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সম্পাদক নিতাই মজুমদার বলেন, চা বাগানের মাটি কাটার ঘটনায় আমরা ভীষণ উদ্বেগে আছি। সংশ্লিষ্ট সমস্ত কর্তৃপক্ষের কাছে আমাদের সংকট মেটাতে আর্জি জানানো হয়েছে। শীঘ্রই মাটি কাটা বন্ধ না হলে একরের পর একর চা বাগান নদীর গ্রাসে চলে যাবে। বিধায়ক হামিদুল রহমান বলেন, সমস্যাটি শুনেছি। এটা ঠিক আগামী বর্ষায় কয়েক একর চা বাগান নদী গিলে নিতে পারে। কিন্তু মালিকদের একাংশই মাটি বিক্রি করেছেন বলে শুনেছি। বেআইনিভাবে কেউ মাটি কেটে থাকলে পুলিশের কাছে অভিযোগ জানানো হোক। পুলিশ নিশ্চয় ব্যবস্থা নেবে। রাজনৈতিক ছত্রছায়ার অভিযোগ ভিত্তিহীন। তবে রয়্যালটি ফাঁকি এবং জাল করার ঘটনা ইতিপূর্বে ঘটেছিল। ফলে ভূমিসংস্কার দপ্তরের কড়া নজরদারির প্রয়োজন রয়েছে।