স্টিয়ারিং হাতে সংসার চালান বালুরঘাটের স্মিতা

1006

পঙ্কজ মহন্ত : তিন ছেলেমেয়ে নিয়ে সংসার চালাতে হিমসিম খাওয়ার জোগাড়। স্বামীর যৎসামান্য কৃষিকাজের পরে ঘরে নুন আনতে পান্তা ফুরোয় অবস্থা। একসময় সামাজিক বেড়াজালের ভ্রূকুটি হেলায় উড়িয়ে সংসারের হাল ধরতে গাড়ির স্টিয়ারিং হাতে তুলে নিয়েছিলেন বালুরঘাট ব্লকের ভাটপাড়া গ্রাম পঞ্চায়েতের স্মিতা মুর্মু। কেউ হেসেছিল, কেউ বাঁকা চোখে তাকিয়েছিল। নানা প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে দীর্ঘ আট বছর ধরে জেলার প্রথম পণ্যবাহী গাড়ির চালক হয়ে উঠেছেন স্মিতা মুর্মু। প্রতিদিন গাড়িতে পণ্য নিয়ে দূরদূরান্তের বাজারে পৌঁছে দিচ্ছেন তিনি। আর এইভাবেই অসুস্থ স্বামীর চিকিৎসার খরচ থেকে ছেলেমেয়ের পড়াশোনা, এককথায় সংসারের ভার নিজের কাঁধে তুলে নিয়েেন তিনি। দক্ষিণ দিনাজপুরের সীমান্তবর্তী প্রত্যন্ত আদিবাসী গ্রামের বধূ স্মিতার অন্নপূর্ণা হয়ে ওঠার গল্প ছড়িয়ে যাচ্ছে গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে। জেলার প্রশাসনিক কর্তারা তাঁর কথা জানার পর মেনে নিয়েছেন, একান্তই পুরুষশাসিত গাড়িচালক পেশায় তিনি ব্যতিক্রম, নারীশক্তির প্রতীক। তাই আগামীদিনে বালুরঘাট ব্লকে সরকারি কাজের ব্র‌্যান্ড অ্যাম্বাসাডর হিসাবে তাঁকে তুলে ধরার চেষ্টা করছে প্রশাসন।

বালুরঘাট ব্লকের ভাটপাড়া গ্রাম পঞ্চায়েতের দুধকুরিগ্রামের বাসিন্দা আদিবাসী মহিলা স্মিতা মুর্মু। স্বামীর নাম বিজয় মুর্মু। বাড়িতে এক ছেলে ও দুই মেয়ে। আর্থিক দিক থেকে সচ্ছল না হওয়ায় ও স্বামীর কৃষিকাজের আয়ে সংসার ঠিকমতো চলছিল না। জমির ধান আনার জন্য ঋণ করে স্মিতা ও তাঁর স্বামী একটি পণ্যবাহী গাড়ি কেনেন। প্রথমে একজন গাড়ির চালক ঠিক করা হয়েছিল। কিন্তু কিছুদিন পরেই সেই চালক গাড়ি চালানোর দায়িত্ব ছেড়ে দেয়। এদিকে, স্মিতাদেবীর স্বামীর চোখ ও পায়ের সমস্যা থাকায় গাড়ি চালাতে পারতেন না। বাড়িতেই পড়ে থেকে গাড়িটি নষ্ট হচ্ছিল। সংসারের হাল ধরতেই একদিন স্মিতাদেবী স্টিয়ারিং হাতে ধরেন। আদিবাসী পরিবারের এক অল্পশিক্ষিত মহিলার এমন সাহস দেখে অনেকে চমকে উঠেছিল।

- Advertisement -

নিজের সমাজে তো বটেই, বালুরঘাট শহরে যেদিন পণ্যবোঝাই করে তাঁর গাড়ি ঢুকেছিল সেদিন অনেকের মুখে কথা ছিল না। তারপর থেকে বহু মানুষের কটূক্তি ও নানারকম বাধা উড়িয়ে দিয়ে দিনের পর দিন আনাজ নিয়ে বিভিন্ন গ্রামীণ হাটে গাড়ি নিয়ে যান। ২০১২ সাল থেকে এই কাজ করেই সংসার এবং ছেলেমেয়ে পড়াশোনার খরচ বহন করছেন। এভাবেই বড় মেয়ে বিয়ে দিয়েছেন। এক মেয়ে কলেজে এবং ছেলে স্কুলে পড়ছে। ভোর হলেই স্মিতা গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়েন। ফিরতে ফিরতে কোনওদিন সন্ধ্যা, আবার কোনওদিন মাঝরাত হয়ে যায়। তবু ভয়কে তুড়ি মেরে উড়িয়ে স্মিতা জেলার বিভিন্ন প্রান্তে দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন। প্রচোজনে জেলার বাইরেও যাচ্ছেন। তিনি বলেন, গাড়ি চালানো শুরু করার প্রথমদিকে অনেক সমস্যা হয়েছিল। অনেকে পাশে দাঁড়িয়েছিলেন, আবার অনেকে নানারকম বাঁকা কথা বলতেন। কিন্তু আমি কারও কথায় কান দিতাম না। আমার পরিবার আমার পাশে থেকে আমাকে সবসময় সাহস জুগিয়েছে। আগে রাতবিরেতে যখন একা ফিরতাম, তখন একটু ভয় হত। এখন সেই ভয়টাও কেটে গিয়েছে। আমি জানি, ভয় পেলে আমার সংসার চলবে না। আমি মনে করি চেষ্টা করলেই মেয়েরা সবকিছুই করতে পারে।

স্বামী বিজয় মুর্মু শারীরিক অসুস্থতার জন্য এখন কৃষিকাজ করতে পারেন না। এখন পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী স্মিতা। কিন্তু লকডাউনের জন্য দীর্ঘদিন হাট বন্ধ থাকায় প্রচুর ক্ষতি হয়েছে। তাছাড়া, গ্রামগঞ্জে বেআইনি ভুটভুটির জন্য ব্যবসায় ক্ষতি হচ্ছে। বিজয় মুর্মু বলেন, আমি গাড়ি চালাতে না পারলেও স্ত্রীকে কখনোই গাড়ি চালাতে নিষেধ করিনি। অনেক সময় আমার স্ত্রী কাজের সূত্রে বাইরে থাকেন। তখন কেউ পণ্যবাহী গাড়ি ভাড়ার খোঁজ করতে এলে আমি ভাড়ার ব্যবস্থা করে রাখি। স্মিতাদেবীর মেয়ে মধুমিতা বলেন, মাকে নিয়ে আমরা সবাই গর্ববোধ করি। তিনি স্বাবলম্বী হতে চাওয়া মেয়েদের কাছে দৃষ্টান্ত। মেযো হাতা-খুন্তি নিয়ে রান্নাঘরে আটকে থাকে না, গাড়ির স্টিয়ারিং পর্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে ধরতে পারে। তারই উদাহরণ আমার মা।

বালুরঘাট মিনি ট্রাক ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সম্পাদক পিন্টু দাস বলেন, স্মিতাদেবীর পণ্যবাহী গাড়ি চালানোর কথা আমরা জানি। তিনি ছাড়া আর কোনও মহিলা এই পেশায় নেই। সব মহিলাদের কাছে স্বাবলম্বী হওয়ার ক্ষেত্রে তিনি অনুপ্রেরণা। তাঁর কোনও প্রয়োজন হলে আমরা সাংগঠনিক দিক থেকে অবশ্যই দেখব। বালুরঘাটের যুগ্ম বিডিও শুভঙ্কর আচার্য বলেন, বর্তমান সময়ে যেখানে নারীদের উপর অত্যাচারের খবর অহরহ আসছে সেখানে এক মহিলার স্বনির্ভর হয়ে ওঠা অবশ্যই প্রশংসনীয়। তাঁর এই লড়াইয়ে কথা আমাদের জানা ছিল না। আমরা অবশ্যই তাঁর সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করব। আগামীতে নির্বাচন কমিশনের প্রচার সহ সরকারি বিভিন্ন কাজে তাঁকে ব্লক অ্যাম্বাসাডর হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করা হবে।