সীমান্তের গ্রামে উড়ছে কাঁচা টাকা, উড়ছে মৃত্যুভয়

125

উত্তরবঙ্গ ব্যুরো : চারপাশে ঝাউ গাছ। মখমলের মতো সবুজ ঘাসের মাঝখান দিয়ে সরু সিমেন্টের রাস্তা রয়েছে তিনবিঘা করিডরে। সেখান দিয়ে বিভিন্ন গাড়িতে যাতায়াত করেন বাংলাদেশি নাগরিকরা। এত কাছে, ছোঁয়া যায়। কথা বলা যায়। একদিকে বাংলাদেশের দহগ্রাম, অন্যদিকে পাটগ্রাম।

সেদিন সরু চওড়া রাস্তাটা দিয়ে ভারতের এক ভদ্রমহিলা তাঁর ছেলেকে নিয়ে একটু এগিয়েছেন। রে-রে করে দূর থেকে ছুটে এলেন বিএসএফ জওয়ান। ওখান দিয়ে হাঁটা যাবে না। সেই জওয়ান ও তাঁর সঙ্গীরা এতদিনে নিশ্চয়ই একটা খবর জেনে গিয়েছেন। দিনকয়েক আগে মেখলিগঞ্জ লাগোয়া আমলাগুড়ি গ্রামে বিএসএফের হাতেই ধরা পড়েছেন এক বাংলাদেশি প্রবীণা। তারপর যা শোনা যায়, তা একইসঙ্গে মর্মান্তিক ও অকল্পনীয়।

- Advertisement -

মাঝরাতে দহগ্রামের দিকে খোলা সীমান্ত পেরিয়ে অসুস্থ বৃদ্ধা চলে এসেছিলেন একেবারে শিলিগুড়িতে। ডাক্তার দেখানোর জন্য। তাঁকে ভারতে ঢুকিয়ে দেয় বাংলাদেশের এক পাচারকারী। ৫ হাজার টাকা নিয়ে ভারতের এক পাচারকারী ১০ হাজার টাকা নিয়ে তাঁকে পৌঁছে দেন শিলিগুড়ি। ডাক্তার দেখিয়ে তিনি আমলাগুড়িতেই ফিরে এসেছিলেন, ওই যুবকের বাড়ি থাকার জন্য। ফিরে যাওয়ার কথা ছিল সেদিনই। কিন্তু অসুস্থ হওয়াতেই এলোমেলো হয়ে যায় হিসেব। স্থানীয়দের হাতে ধরা পড়ে যান। পালিয়ে যান ওই সাহায্যকারী।

এই গল্পের মধ্যে অনেক বেদনা লুকিয়ে রয়েছে, লুকিয়ে রয়েছে অসহায়তা। কিন্তু দুই বাংলার মধ্যে ২,২১৬.৭০ কিলোমিটার সীমান্তে এটাই সব নয়। ভদ্রমহিলা তো গিয়েছিলেন ডাক্তার দেখাতে। অনেক বাংলাদেশি তো এখান দিয়ে ভারতে ঢুকে নয়াদিল্লি, কেরলের মতো জায়গায় চলে যান শ্রমিকের কাজ করতে। আরও উচ্চাকাঙ্ক্ষী, আরও ধনীরা দালালের মাধ্যমে পাড়ি দেন ইউরোপের দিকেও। এর পাশাপাশি সীমান্তজুড়ে চলছে ড্রাগ পেডলার, নারী ও শিশু পাচারকারী, গোরু পাচারকারীদের রমরমা। সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া ১,৬৩৮ কিলোমিটার। বাকি ৫৭৮.৭০ কিলোমিটার সীমান্ত ফাঁকা পড়ে। কত ধরনের নোংরামো যে চলে, তার হিসেব রাখা কঠিন। দিনে একরকম, রাত বাড়লে একরকম। সবই এলাকার মানুষের অপরিসীম দারিদ্রের সুযোগ নিয়ে

কোচবিহারের তোর্ষাপাড়ের সীমান্তে একরকম নিয়ম, মালদায় গঙ্গা-মহানন্দা পাড়ের সীমান্তে আবার চোরাকারবারিদের আরেক নিয়ম। কোথাও শীতকালের ঘোর অমাবস্যায় গোরু পাচার করা সুবিধে, কোথাও আবার বর্ষাকালে। গোরু পাচারের স্টাইলও পালটে যায়। মিল একটাই। সব জায়গায় স্থানীয় রাজনৈতিক নেতারা একেবারে চুপ। কোনও পার্টিই টানা প্রতিবাদ করে না। যত মৃত্যুই আসুক।

তুফানগঞ্জের কাছে সীমান্ত লাগোয়া গ্রামে খোঁজ নিয়ে জানা গেল, গোরু পাচারকারীদের একাংশ প্রথমে গ্রামে গ্রামে ঘুরে খোঁজ নেয়, কারা দুঃস্থ। টার্গেট করা হচ্ছে সেই পরিবারের ছেলেদেরই। একটি গোরু সীমান্তে পৌঁছে দিলে মেলে ১০ হাজার টাকা। একজন চারটি গরু পাঠিয়ে দিতে পারলে দুতিন ঘণ্টার পরিশ্রমে চল্লিশ হাজার টাকা চলে আসবে ঘরে। চ্যাংরাবান্ধা অঞ্চলে অনেকেই সন্ধের দিকে দেখেন গোরু পাচারকারীদের। স্থানীয়দের অনেকের গোয়ালেই তারা আগে গোরু রেখে দেয় বোঝাপড়ার ভিত্তিতে। অন্ধকার হলে সেখান থেকে নিজেরাই নিয়ে চলে যায় গোরুগুলোকে। স্থানীয় মানুষ দেখেও দেখেন না।

বাংলাদেশ-ভারত এখন সরকারিভাবে যাতায়াত বন্ধ। ওপারের লালমনিরহাট, রংপুরের অনেক মানুষ তবু এ দেশে আসছেন। কী করে? তিনবিঘার ধারে দহগ্রাম-আঙ্গারপোঁতা খোলা সীমান্তকে কাজে লাগিয়ে এখানে দুধারে কৃষিজমি, বাড়িঘর। বিএসএফের নজর এড়িয়ে যাতায়াত সোজা। দুটো দেশের অপরাধীরাই নিজের দেশে অপকর্ম করে অন্য দেশে পালিয়ে যায়। পাচারকারীরা এপার থেকে গোরু, ধান, চাল, কসমেটিক্স নিয়ে যায় বাংলাদেশে। ওপার থেকে বেশি আসে ইলিশ, শিঙি, মাগুরের মতো মাছ। এলাকার বিভিন্ন গ্রামে মজুত হয় পাচার করার সব জিনিসপত্র।

পাচারের স্টাইল কীভাবে পালটেছে? হিলি সীমান্তে দাঁড়িয়ে সেখানকার স্থানীয় মানুষ যা বলছিলেন, তাতে বেরিয়ে আসে একটি তথ্য। পাচারকারীরা এখন বেশি করে অস্ত্র করছে কিশোর বা নারীদের। তাঁদের সন্দেহ করা কঠিন। আবার তাঁদের শাস্তি দেওয়াও কঠিন। এরাই ক্যারিয়ার।

বাংলাদেশ থেকে যে দুষ্কৃতীরা ভারতে দলবেঁধে ঢোকে, তাদের হিলি অঞ্চলে বলে চোরপার্টি। এরা অনেকেই ভারতীয় পাচারকারীদের সাহায্যে বিএসএফ জওয়ানদের ওপর হামলা চালায় রামদা, কুড়াল নিয়ে বা বিএসএফকে নানাভাবে বিভ্রান্ত করে। মাঝে মাঝে শারীরিক অত্যাচার, শ্লীলতাহানির অভিযোগ পর্যন্ত আনা হয় তাঁদের বিরুদ্ধে। যাতে সীমান্তরক্ষীরা একটু গুটিয়ে যান। বিএসএফই বা কী কম? সীমান্তের অনেকে আবার বিএসএফ জওয়ানদের কাজে লাগিয়ে প্রতিবেশীর ওপর রাগ পুষিয়ে নেন। ভুল খবর দিয়ে যাতে জওয়ানরা বারবার হেনস্তা করেন ওই প্রতিবেশীদের।

সব মিলিয়ে সীমান্তে চলে নানা নাটক। সীমাহীন দারিদ্র্যের মাঝে কোথাও কোথাও ওড়ে অজস্র কাঁচা টাকা। ওড়ে মৃত্যুর ভয়, অত্যাচারের আতঙ্ক। কোচবিহার থেকে মালদা- এসব নিয়ে বেঁচে আছেন সীমান্তের মানুষ। (চলবে)

তথ্যঃ দীপেন রায়, রাজীব বসাক, বিধান ঘোষ