ময়নাগুড়ির গুদাম থেকে বস্তা বদলে র‌্যাশন পাচার

404

শুভঙ্কর চক্রবর্তী, ময়নাগুড়ি : বিভিন্ন জায়গা থেকে লরি ভর্তি করে র‌্যাশনের চাল, গম, আটা নিয়ে এসে মজুত করা হচ্ছে গুদামে। সেখানে নতুন বস্তায় ভরে সেগুলি চলে যাচ্ছে উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলার খোলা ও পাইকারি বাজারে। এভাবেই মাসের পর মাস ধরে চলছে র‌্যাশনের সরকারি সামগ্রীর চোরাকারবার। সেই কারবারে যুক্ত বড়সড়ো চক্রের হদিস মিলল ময়নাগুড়িতে। স্টিং অপারেশন চালিয়ে শুক্রবার চোরাকারবারিদের ঘাঁটিতে পেঁছে গেল উত্তরবঙ্গ সংবাদ।

পুলিশের নাকের ডগায় ময়নাগুড়ি শহরঘেঁষা বাইপাসের ধারে তিনটি গুদামে দীর্ঘদিন থেকে ওই কারবার চলছে। স্টিং অপারেশনের পর র‌্যাশনের সামগ্রীর চোরাকারবারের কথা স্বীকার করেই নিয়েছেন গুদাম মালিক রাজু সাহা। খাদ্য সরবরাহ দপ্তর, পুলিশ, প্রশাসনের নজর এড়িয়ে দিনের পর দিন কীভাবে ওই কারবার চলছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে সব মহলেই। যদিও সবটা শোনার পর জলপাইগুড়ির জেলা শাসক মৌমিতা গোদারা বসু বলেন, কোনওভাবেই র‌্যাশনের সামগ্রী বাইরের গুদামে যাওয়ার কথা নয়। আমরা গোটা বিষয়টি তদন্ত করে উপযুক্ত পদক্ষেপ করব।

- Advertisement -

গরিব মানুষের জন্য বিনাপয়সায় যে চাল, গম দিচ্ছে সরকার সেই সামগ্রী কীভাবে অসাধু ব্যবসায়ীদের কাছে পৌঁছাচ্ছে তা জানতে শুক্রবার বেলা একটায় ময়নাগুড়ির ওই গুদামে পৌঁছে যায় উত্তরবঙ্গ সংবাদ। বাইপাসে দুটি মোটরবাইক সংস্থার শোরুমের মাঝামাঝি যে ওয়েব্রিজ আছে তার পিছনেই রয়েছে গুদামগুলি। সেই ব্রিজের পাশের বিশাল লোহার গেট ঠেলে খানিকটা ভিতরে ঢুকতেই দেখা যায় সার সার দাঁড়িয়ে বস্তা বোঝাই লরি। দুটি লরি থেকে তখন গুদামে বস্তা ঢোকানো হচ্ছিল আর গুদাম থেকে বস্তা বের করে তোলা হচ্ছিল আরেকটি লরিতে। এগিয়ে গুদামে ঢুকতেই চক্ষু চড়কগাছ। বিশাল গুদামের ভিতরে তখন জোরকদমে চলছিল র‌্যাশনের আটা, চাল, গমের বস্তা বদলানোর কাজ।

র‌্যাশনে দেওয়া আটার প্যাকেট কেটে সাদা প্লাস্টিকের বস্তায় ভরছিলেন স্থানীয় শ্রমিক ছোট্টু রায়। কোথা থেকে এল র‌্যাশনের আটা? প্রশ্ন শুনে ছোট্টুর উত্তর, শুধু আটা নয়, চাল, গম সব আছে। আমরা এক বস্তা থেকে বের করে অন্য বস্তায় ভরে দিই। প্রতিদিন অনেক ট্রাক আসে। এখান থেকে চাল, আটা অনেক দূরে দূরে যায়। বাইরে তখন জনাপঁচিশেক শ্রমিক কাজ করছিলেন। তাঁদের মধ্যে দু-তিনজন প্রশ্ন করার কারণ জানতে চান। সাংবাদিক পরিচয় দিতেই কথা না বাড়িয়ে কিছুক্ষণের মধ্যেই তাঁরা গুদামের বাইরে চলে যান। গুদামের ম্যানেজার (বারবার জিজ্ঞাসা করলেও নাম বলেননি) বলেন, বিভিন্ন এলাকার পাইকারদের কাছ থেকেই র‌্যাশনের সামগ্রী কিনে নিই আমরা। তারপর ছাড়াই করে সেগুলি বিভিন্ন জেলার বাজারে বিক্রি করি। তবে কারা সেই পাইকার, তাঁদের কাছে র‌্যাশনের সামগ্রী আসে কোথা থেকে, সেইসব প্রশ্নের কোনও উত্তর দিতে চাননি তিনি।

খোঁজখবর নিয়ে জানা যায় গুদামগুলির মালিক সুমন সাহা। সুমনবাবু ওয়েব্রিজটিও পরিচালনা করেন। তিনি জানান, বছরখানেক আগে রাজু সাহা নামে ময়নাগুড়ির এক ব্যবসায়ীকে তিনি গুদামগুলি ভাড়া দিয়েছেন। সুমন বলেন, আমি নিয়ম মেনে ভাড়া দিয়েছি। ওখানে কীসের কারবার চলছে সেটা আমার জানার বিষয় নয়। প্রতিদিনই অনেক লরি আসে। এর বেশি কিছু বলতে পারবো না। রাজু সাহা বলেন, আমরা বাজার থেকে র‌্যাশনের চাল, গম, আটা কিনি। পাইকারিভাবেও কেনা হয়। সেগুলি বাইরে বিক্রি করি। চোরাকারবারের অভিযোগ সঠিক নয়।

সূত্রের খবর, গোটা কারবারের পিছনে খাদ্য সরবরাহ দপ্তরের কর্মী-আধিকারিকদের একাংশ তো রয়েছেনই, বেশ কিছু এমআর ডিলারও এই কারবারে যুক্ত। তাঁদের মদত ছাড়া লরির পর লরি সরকারি খাদ্যসামগ্রী এভাবে বাইরে আসতে পারে না বলেই মত খাদ্য দপ্তরের পদস্থ আধিকারিকদের।

সূত্রের খবর, জলপাইগুড়ি জেলার বিভিন্ন এলাকা ছাড়াও কোচবিহার ও আলিপুরদুয়ারের কিছু এলাকা থেকেও র‌্যাশনের খাদ্যসামগ্রী ময়নাগুড়ির গুদামগুলিতে আসে। প্যাকেট বদলানোর পর সেগুলি উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলার বাজারে চলে যায়। কয়েকজন ব্যবসায়ীর মাধ্যমে ওই চাল, আটা জয়গাঁ হয়ে ভুটানেও যাচ্ছে। প্রতিদিন কয়েক লক্ষ টাকার কারবার হচ্ছে ময়নাগুড়ির ওই গুদামগুলি থেকে। বাইপাস ছাড়াও ময়নাগুড়ি বাজারের কাছেও আরও একটি গুদাম আছে যেখান থেকে এই কারবার চলছে। জলপাইগুড়ির খাদ্য সরবরাহ আধিকারিক অমৃত ঘোষ বলেন, এখনও পর্যন্ত বিষয়টি জানি না। খোঁজ নিয়ে পদক্ষেপ করা হবে।