টোপ দিয়ে ইটভাটা থেকে ছেলেকে আনে পাচারকারীরা

103

রাজীব বসাক, তুফানগঞ্জ : বছর দুয়েক আগেকার কথা। দেওচড়াই গ্রাম পঞ্চায়েতের কৃষ্ণপুর গ্রামে গোরু পাচার করতে গিয়ে বিএসএফের গুলিতে মারা যায় চারজন। মৃতদের মধ্যে আমের আলির ছোট ছেলে আবদুল্লা শেখ ছিল। তাতে এই সীমান্ত দিয়ে গোরু পাচার না কমলেও খালি হয়েছে আমের আলি শেখের বুক।

আমের আলি বলেন, সংসারে অভাব নিত্যসঙ্গী। অভাব থাকলেও পরিশ্রম করে সংসার চালাত। কিছুদিন আগে বিহারে ইটভাটার কাজে গিয়েছিল ছেলেটা। সেখান থেকে অতিরিক্ত অর্থের লোভ দেখিয়ে তাকে বাড়িতে ফিরিয়ে আনে পাচারকারীরা। বাড়িতে আসতেই তাকে নিয়ে যাওয়া হয় কৃষ্ণপুর গ্রামের ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে। প্রথমদিকে দুদিন গিয়ে সীমান্তের কাছ থেকে ওরা ঘুরে আসে। বিএসএফের কড়া পাহারায়  গোরু পাচার করতে পারেনি। শেষে আসে ওই অভিশপ্ত রাত। সন্ধ্যা তখন ৭টা। রাতের খাবার খেতে বসবে আবদুল্লা। ভাত বেড়ে খাওয়ার জন্য ডাকছিল ওর স্ত্রী। সেই সময়ই বাইক নিয়ে বাড়ির সামনে আসে পাচারকারীরা। তাকে খেতেও দেয়নি। বাইকে তুলে নিয়ে যায়। যাওয়ার আগে কোন সীমান্তে যাচ্ছে সেটা বলে গিয়েছিল। সেই রাতে কৃষ্ণপুর গ্রামে ওঁত পেতে ছিল বিএসএফ। একসময় গোরু পাচারকারীদের সঙ্গে শুরু হয় সংঘর্ষ। বিএসএফ গুলি চালায়। মৃত্যু হয় চারজনের। ওদের মধ্যে আমার ছেলেটাও ছিল।

- Advertisement -

আর কথা বলতে পারছিলেন না আমের আলি। অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে নিজেকে সামলে নিলেন। বললেন, এই ঘটনার পরই এলাকার যুবকদের সীমান্তে পাচার করতে যেতে মানা করে আসছি। যাতে আমার মতো আর কোনও বাবা-মায়ের বুক খালি না হয়। পাচারকারীদের মাথারা বহাল তবিয়তে বাড়িতে স্ত্রী, সন্তানদের নিয়ে রয়েছে। কিন্তু আমাদের কষ্ট বোঝার কেউ নেই।

এমন গল্প সীমান্তের গ্রামের অনেকের ঘরে। তবে, বেশি কিছু বলার জো নেই। পাচারের কথা নিয়ে জিজ্ঞাসা করতেই পাশ কাটিয়ে চলে যাচ্ছে সবাই। সবার মুখেই আতঙ্কের ছাপ। কয়েকজন অবশ্য ক্ষোভ উগরে দিলেন। তাঁদের কথায়, গুটিকয়েক পাচারকারীর জন্য দুর্নামের ভাগীদার হচ্ছে গোটা সীমান্ত এলাকা। কৃষ্ণপুর সীমান্তের বাসিন্দা ওসমান আলি, বলাই বর্মন জানান, মূলত দুইভাবে পাচার হয় গোরু। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে লাইনম্যানের ওপর ভরসা করে চলে পাচার। বিভিন্ন রাস্তা দিয়ে  গোরু পেঁছায় সীমান্তের কাছে। এই লাইনম্যানই ঠিক করে সীমান্তের কোন এলাকা দিয়ে পাচার করা হবে গোরুগুলি। লাইনম্যানের ঠিক করা জায়গা দিয়ে কাঁটাতার কেটে বা অস্থায়ীভাবে কল বানিয়ে চলে পাচার।

বালাভূত সীমান্তের বাসিন্দা এক্রামুল হক, হাফেজ আলি জানালেন, সম্প্রতি অসম থেকে ডাঙ্গোয়াল এনে পাচার চলছে। কারণ কৃষ্ণপুরের গুলি কাণ্ডের পর এলাকার অনেকেই পাচারের কাজে যেতে ভয় পায়। পাচারের ক্ষেত্রে বেশিরভাগ সময়ই নদীপথ ব্যবহার করা হচ্ছে। কাঁটাতার কেটে পাচার করা খুব ঝুঁকির হয়ে গিয়েছে।

গ্রামের বাসিন্দারাই জানালেন, এলাকার দারিদ্র্যের সুযোগ নিয়ে পাচার চলে সীমান্তে। গোরু পাচারের সঙ্গে যুক্ত কয়েকজন গ্রামে গ্রামে ঘুরে দুঃস্থদের টার্গেট করে। অভাবের সুযোগ নিয়ে তাঁদের বাড়িতে পেঁছে যায় পাচারকারীরা। টাকার লোভ দেখানো শুরু হয়। একটি গোরু সীমান্তের ওপারে পেঁছে দিলেই মেলে ১০ হাজার টাকা। এক রাতে একজন ডাঙ্গোয়াল চারটি গোরু ওপারে পাঠাতে পারে। একসঙ্গে ৩০-৪০ জন ডাঙ্গোয়াল মিলে পাচারে শামিল হয়। রাতের দুতিন ঘণ্টার পরিশ্রমে মেলে ১০ থেকে ৪০ হাজার টাকা।

একবার পাচার করতে পারলেই এক মাস আরামে কাটবে। তাই টাকার লোভ সামলাতে না পেরে ছুটে যায় অনেকেই। আর এই ঝুঁকি নিতে গিয়ে কখনো-কখনো মৃত্যু ডেকে আনে তারা। তুফানগঞ্জ-১ ব্লকের বালাভূত গ্রাম পঞ্চায়েতের বালাভূত, দেওচড়াই গ্রাম পঞ্চায়েতের কৃষ্ণপুর, সিতাইয়ের পশ্চিম চামটা সীমান্ত গ্রামের ঘটনা তারই প্রমাণ।

শুধু গোরু নয়, লবণ থেকে শুঁটকি মাছ-সবই এভাবে চোরাপথে সীমান্ত পেরিয়ে যায়। এই পাচার চক্রের হাত এতটাই লম্বা যে রাজনৈতিক দলগুলিও সীমান্তের পাচার নিয়ে আন্দোলন করতে যায় না। দেওচড়াই গ্রাম পঞ্চায়েতের এক পঞ্চায়েত সদস্য বলেন, আমাদের গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকা দিয়ে গোরু পাচার এখনও হয়। সীমান্তে চারজন পাচারকারীর মৃত্যুর পর অবশ্য পাচারের প্রবণতা কমেছে অনেকটাই। আর যাতে কেউ এ ধরনের কাজে যুক্ত না হয় তার জন্য জনসংযোগ বাড়িয়ে দিয়ে গ্রামবাসীদের বোঝানো হচ্ছে। পঞ্চায়েত সদস্য এবং বিএসএফ মিলিতভাবে রাতে কাজ করছে। গ্রামবাসীদের কয়েকজন একধাপ এগিয়ে বললেন, যদি গ্রামে কাজের সুযোগ মেলে, যদি হতদরিদ্র পরিবারগুলোর দুবেলা দুমুঠো খাবারের জোগাড় হয় তাহলে এমনিতেই পাচার বন্ধ হয়ে যাবে।