উত্তর দিনাজপুর জেলাজুড়ে নকল সার, কীটনাশক তৈরির চক্র

165

বিশ্বজিৎ সরকার, রায়গঞ্জ : উত্তর দিনাজপুর জেলায় নকল সার ও কীটনাশক তৈরির চক্র সক্রিয় হয়ে উঠেছে। জেলার একাধিক জায়গায় নকল সার ও কীটনাশক তৈরির কারখানার হদিস পেয়েছে কৃষি দপ্তর। শুধু তাই নয়, কৃষকদের জন্য সরকারি ভর্তুকিযুক্ত রাসায়নিক সার বিভিন্ন জেলা থেকে ভিনরাজ্যে পাচারের অভিযোগও উঠেছে। ভর্তুকির বিপুল পরিমাণ সার প্লাইউড কারখানায় চলে যাচ্ছে বলে অভিযোগ। উত্তর দিনাজপুর জেলায় প্রতিবছর ভর্তুকি সার এলেও তা পাচারকারীদের হাত ধরে ভিনরাজ্যে এমনকি হাতবদল হয়ে বাংলাদেশেও পাচার হয়ে যাচ্ছে। এছাড়া জেলায় নকল সার কারখানা ছেয়ে যাওয়ায় ক্ষতির মুখে পড়ছেন কৃষকরা। বুঝতে না পেরে সেই সার ও কীটনাশক জমিতে ব্যবহার করে সমস্যায় পড়ছেন চাষিরা। জেলার কয়েকটি জায়গায় নকল সার ও কীটনাশক তৈরি হচ্ছে বলে জেলা কৃষি দপ্তরের ডেপুটি ডিরেক্টর নিজেই স্বীকার করে নিয়েছেন। কৃষি দপ্তরের ডেপুটি ডিরেক্টর (প্রশাসক) বিপ্লবকুমার ঘোষ বলেন, জেলার কয়েকটি জায়গায় নকল সার ও কীটনাশক তৈরি হচ্ছে বলে আমরা জানতে পেরেছি। এই ধরনের অসাধু চক্রের বিরুদ্ধে শীঘ্রই অভিযানে নামা হবে। তিনি বলেন, সম্প্রতি রায়গঞ্জ থানার মারাইকুরা গ্রাম পঞ্চায়েতের তুলসীপাড়া এলাকায় একটি নকল সারের কারখানায় হানা দিয়ে প্রচুর পরিমাণে নকল সার উদ্ধার করা হয়েছে। অভিযুক্তের বিরুদ্ধে রায়গঞ্জ থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের হয়েছে।

প্রশাসন সূত্রে জানা গিয়েছে, গত বছর নভেম্বর মাসে রায়গঞ্জ থানার রূপাহার এলাকায় অভিযান চালানো হয়। সেখানকার এক ব্যবসায়ী নিজের কারখানার আড়ালে নকল সার ও কীটনাশক তৈরি করছিলেন। কৃষি দপ্তর অভিযান চালিয়ে প্রচুর পরিমাণে নকল সার তৈরির সরঞ্জাম উদ্ধার করে। একই কায়দায় রায়গঞ্জ থানার মারাইকুরা গ্রাম পঞ্চায়েতের তুলসীপাড়া এলাকাতেও নকল সার উদ্ধার করা হয়। এক কারখানার মালিককে গ্রেপ্তারও করে পুলিশ। সোহারই মোড় এলাকায় একটি নকল সারের কারখানার হদিস পেয়ে কারখানা সিল করা হয়। তিন মাসে উত্তর দিনাজপুর জেলায় এইভাবে ২২টি কারখানায় হানা দিয়েছেন কৃষি দপ্তরের আধিকারিকরা। তবে এখনও জেলার বিভিন্ন জায়গায় একইভাবে ওই অবৈধ কারবার চলছে। সারের প্যাকেটে বালির সঙ্গে বিভিন্ন রাসায়নিক মিশিয়ে তা বিক্রি করা হচ্ছে। সারের দোকানদারদের একাংশ সেই নকল সার বিক্রি করছে। আসল সারের চেয়ে অর্ধেক দামে নকল সার পাচ্ছেন দোকানদাররা। মোটা মুনাফার লোভে পড়ে এই অসাধু চক্রে জড়িয়ে পড়ছেন তাঁরা। প্যাকেটের চাকচিক্য দেখে কম দামে পেয়ে সেই নকল সারই কিনে নিয়ে যাচ্ছেন অনেক চাষি। সেই সার জমিতে দিয়ে কোনও ফল পাচ্ছেন না তাঁরা। এতে একদিকে যেমন ফলন মার খাচ্ছে, তেমনি আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন কৃষকরা। আবার সার ও কীটনাশকের নামে কোম্পানিগুলিও ক্ষতির মুখে পড়েছে।

- Advertisement -

জেলার ফার্টিলাইজার ইউনিয়নের সম্পাদক রতন আগরওয়াল বলেন, যারা নকল সার তৈরি করে তারা আমাদের সংগঠনের সদস্য নয়। আমরা এই ধরনের অসাধু ব্যবসাকে কখনই সমর্থন করি না। আমরা ব্যবসায়ীদের বলেছি, কম দামে সার কিংবা কীটনাশক পেলে তা যেন তাঁরা না নেন। যারা নকল সার তৈরি করে তারা কিন্তু সরাসরি চাষিদের কাছে তা বিক্রি করে না। নকল সার দোকানদারদের হাত দিয়ে চাষিদের কাছে  পৌঁছায়। চাষিরা বলছেন, দোকানদারদের ওপর ভরসা করে তাঁরা সার ও কীটনাশক কেনেন। সার আসল না নকল তা সহজে বুঝতে পারেন না চাষিরা। জমিতে ব্যবহারের পর ফলন ভালো না হলে তাঁরা সমস্যায় পড়েন। চাষিরা যাতে নিজেরাই বুঝতে পারেন কোন সার কিংবা কীটনাশক আসল, সেজন্য তাঁদের সচেতন করা ও প্রশিক্ষণ দেওয়ার দাবিও উঠেছে। চাষিরা জানিয়েছেন, রাজ্য সরকার কৃষিতে উন্নতিসাধনের চেষ্টা করছে। কৃষি জমির খাজনা মকুব, চাষে অনুদান, কৃষকবন্ধু প্রকল্পের মতো পদক্ষেপ করেছে। কিন্তু এরপরেও চাষে ব্যবহৃত সারে যদি ভেজাল থাকে তাহলে কৃষিতে উন্নয়ন কীভাবে সম্ভব হবে? এই প্রশ্ন তুলেছেন জেলার কৃষকরা। এছাড়া এই নকল সার কিনে শীতকালীন আলু, সর্ষে, সবজি সহ বিভিন্ন চাষে তাঁরা সমস্যায় পড়েছেন।