হিন্দুত্বের স্রোতে চলার দাবি কংগ্রেসে, হাইকমান্ড দ্বিধায়

338

নয়াদিল্লি : আটের দশকের শেষভাগ থেকে যে রামমন্দির আন্দোলনের ওপর ভর করে ধীরে ধীরে দেশে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছিল বিজেপি, তা পূর্ণতা পেতে চলেছে আগামী ৫ অগাস্ট অযোধ্যায় রামমন্দিরের শিল্যান্যাস এবং ভূমিপুজোর মধ্যে দিয়ে। কট্টর বিজেপি বিরোধীরাও জানে, ওই অনুষ্ঠানের মধ্যে দিয়ে হিন্দু-হিন্দি-হিন্দুস্তান গড়ার লক্ষ্যে আরও এককদম এগোবে বর্তমান সরকার। নেহরু-গান্ধি পরিবার রামমন্দিরের শিলান্যাসের প্রশ্নে মুখে কুলুপ আঁটলেও কংগ্রেসের একটা বড় অংশের ধারণা, বিজেপির মোকাবিলায় অবিলম্বে রামনামেরই শরণ নেওয়া উচিত। অযোধ্যায় রামমন্দির ইশ্যুতে দলের অবস্থান স্পষ্ট করার দাবি উঠেছে কংগ্রেসের অন্দরে। জওহরলাল নেহরুর ঘরানার ধর্মনিরপেক্ষতাকে দূরে সরিয়ে কংগ্রেসের ভিতর নরম হিন্দুত্বের সওয়াল করার পক্ষে যেমন কমল নাথ, দিগ্বিজয় সিংয়ের মতো পোড়খাওয়া নেতারা রয়েছেন, তেমনই দীপেন্দর সিং হুডা, জিতিন প্রসাদের মতো তরুণ তুর্কিরা আছেন। এই নেতাদের বক্তব্য, অযোধ্যায় রামমন্দিরের শিলান্যাস ও ভূমিপুজো সম্পর্কে সোনিয়া, রাহুল, প্রিয়াঙ্কা গান্ধি ভদরাদের মৌনতা আখেরে সুবিধা করে দিচ্ছে বিজেপির। উত্তরপ্রদেশের মতো বিজেপির শক্ত ঘাঁটিতে আগামী ২০২২ সালের বিধানসভা ভোটে কংগ্রেসকে ঘুরে দাঁড়াতে হলে নরম হিন্দুত্বের পথে চলা ভিন্ন উপায় নেই।

এক ভিডিওবার্তায় মধ্যপ্রদেশের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী কমল নাথ অযোধ্যায় ভূমিপুজোকে স্বাগত জানিয়ে বলেছেন, দেশের মানুষ এর জন্য দীর্ঘদিন অপেক্ষা করছিলেন। প্রত্যেক ভারতীয়র সম্মতি নিয়ে এই মন্দির নির্মাণ করা হচ্ছে। এটা শুধু ভারতেই সম্ভব। এখানেই শেষ নয়। আরও এককদম এগিয়ে নেহরু-গান্ধি পরিবারের ঘনিষ্ঠ এই প্রবীণ নেতার বক্তব্য, আমাদের বিশ্বাসের একেবারে কেন্দ্রস্থলে রয়েছেন ভগবান শ্রীরামচন্দ্র। রামের ওপর আস্থা রেখে দেশ এগিয়ে চলছে। আমরা সবাই চাই, অযোধ্যায় রামের জন্মভূমিতে মন্দির তৈরি হোক, প্রয়াত রাজীব গান্ধিও চাইতেন। কমল নাথের সুরে মধ্যপ্রদেশের আরেক প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী দিগ্বিজয় সিংও জানিয়েছেন, রাজীব গান্ধি চেয়েছিলেন মন্দির তৈরি হোক। জিতিন প্রসাদ, দীপেন্দর সিং হুডারা চান, কমল নাথের লাইনে দল চলুক। এনসিপি সুপ্রিমো শারদ পাওয়ার এবং রামমন্দির আন্দোলনের অন্যতম শরিক শিবসেনার  প্রধান তথা মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী উদ্ধব ঠাকরে করোনা সংকটের মধ্যে অযোধ্যায় ভূমিপুজো নিয়ে যখন সরাসরি প্রশ্ন তুলছেন, কংগ্রেসের অন্দরে তখন ভিন্ন সুর। অনেকের ধারণা, কট্টর হিন্দুত্বের লাইনে ২০১৪ এবং ২০১৯-এর ভোটে বিজেপি বাজিমাত করায় এখন সেই পথে হাঁটতে মরিয়া কংগ্রেসের একাংশ। রাহুল গান্ধি ও প্রিয়াঙ্কা গান্ধি ভদরা এর আগে নরম হিন্দুত্বের পথে একাধিকবার পা বাড়িয়েছেন। রাহুলের কখনও মানস সরোবর যাত্রা, কখনও নিজেকে উপবীতধারী ব্রাহ্মণ দাবি করা সেই পথের অঙ্গ। প্রিয়াঙ্কাও একাধিকবার টেম্পল রান করেছেন উত্তরপ্রদেশের রাজনীতিতে। কিন্তু বিজেপির মতো হিন্দুত্বের পথে কংগ্রেসের কোনও লাভ হবে কি না, তা নিয়ে  প্রশ্ন আছে দলের একাংশে। শশী থারুররা এই অংশের প্রতিনিধি।

- Advertisement -

প্রয়াত বিজেপি নেতা অরুণ জেটলি একবার মন্তব্য করেছিলেন, বিজেপির মতো সাচ্চা হিন্দুত্ববাদী দল থাকতে মানুষ নকল হিন্দুত্ববাদীদের পছন্দ করতে যাবেন কেন! কংগ্রেসের প্রগতিশীল অংশ সেই যুক্তি তুলে ধরে হিন্দুত্বের লাইনে চলার বিরোধিতা করে থাকেন। সম্প্রতি উত্তরপ্রদেশে দলের রণকৌশল ঠিক করতে প্রিয়াঙ্কা গান্ধি ভদরাকে উপস্থিত কংগ্রেস নেতারা জানিয়ে দেন, সমাজবাদী পার্টি সংখ্যালঘু ভোটব্যাংকের কারণে ভূমিপুজো নিয়ে উচ্চবাচ্য করবে না। অখিলেশ যাদব তাই ইশ্যুটিতে চুপ করে রয়েছেন। এই পরিস্থিতিতে কংগ্রেস রামমন্দির ও ভূমিপুজো সম্পর্কে অবস্থান স্পষ্ট না করলে দলেরই ক্ষতি হবে। উত্তরপ্রদেশে হারানো জমি পুনরুদ্ধার করতে গেলে অবস্থান স্পষ্ট করা অত্যন্ত জরুরি। উল্লেখ্য, গতবছর রামমন্দির নির্মাণে সুপ্রিম কোর্টের রায়কে কংগ্রেস স্বাগত জানিয়েছিল। কিন্তু ভূমিপুজো নিয়ে দল উচ্চবাচ্য না করায় অসন্তোষ বাড়ছে কংগ্রেসের অন্দরে। দলের একাংশ সম্প্রতি কংগ্রেস সভানেত্রী সোনিয়া গান্ধির সঙ্গে বৈঠকে রামমন্দির প্রসঙ্গ তুলেছিলেন। তাঁদের বক্তব্য ছিল, রামমন্দির নির্মাণের কৃতিত্ব দাবি করতে কংগ্রেস যেন ইতস্ততবোধ না করে। কারণ, রাজীব গান্ধিই রামমন্দিরের তালা খুলিয়েছিলেন। বিজেপি নেতারা অবশ্য কংগ্রেসকে পাত্তা দিচ্ছেন না। মধ্যপ্রদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নরোত্তম মিশ্র বলেন, কপিল সিবালের মতো কংগ্রেস নেতারা বারবার সুপ্রিম কোর্টে দাবি করেছিলেন, ভগবান রামচন্দ্র একটি কল্পিত চরিত্র। কংগ্রেসই বারবার রামমন্দির নির্মাণের বিরোধিতা করেছে। রামসেতু ছিল না বলেছিলেন কপিল।