দিনমজুর থেকে কোটিপতি, পিকের টিমের নজরে তৃণমূল নেতারা

1034

শুভঙ্কর চক্রবর্তী  কোচবিহার : কেউ ছিলেন দিনমজুর, কেউ কলমিস্ত্রি। কিন্তু জনপ্রতিনিধি হয়ে গত কয়েক বছরে ফুলেফেঁপে উঠেছে তাঁদের সম্পত্তি। কিছুদিন আগেও যাঁদের নুন আনতে পান্তা ফুরায় অবস্থা ছিল এখন তাঁরা কোটি টাকার মালিক। কারও কারও গ্যারাজে রয়েছে একাধিক বিলাসবহুল গাড়ি। আর এই জাতীয় নেতাদের জন্যই প্রতিনিয়ত সাধারণ মানুষের প্রশ্নের মুখে পড়তে হচ্ছে রাজ্যের শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেসকে। কোচবিহারের পুঙ্খানুপুঙ্খ পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করার পর আপাতত এমনটাই মনে করছে পিকের টিম। তাই দলে শুদ্ধিকরণের দাওয়াই দিয়েছে তারা। তৃণমূলের কোচবিহার জেলা সভাপতি বিনয়কৃষ্ণ বর্মন বলেন, তদন্তে যেসব অভিযোগ উঠে এসেছে অনেক ক্ষেত্রেই তা অস্বীকার করার মতো নয়। পিকের টিম মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নির্দেশে কাজ করছে। তারা যেভাবে রিপোর্ট পাঠাবে সেই অনুসারে দল সিদ্ধান্ত নেবে।

এত অল্প সময়ে নেতা, জনপ্রতিনিধিদের হাতে কোটি কোটি টাকা কোন পথে পৌঁছাল সেই খোঁজ করতেই পিকের টিমের নজরে এসেছে বেশ কয়েকজন আমলা, গ্রাম পঞ্চায়েত সচিব, পুরসভার আধিকারিকের নাম। পিকের টিমের সদস্যদের মত, অনেক অল্পশিক্ষিত এবং তুলনায় আইনকানুন সম্পর্কে অনভিজ্ঞ জনপ্রতিনিধিদের দুর্নীতির রাস্তা বাতলে দিয়েছেন ওইসব আমলা, সচিবরা। কোচবিহারে গত কয়েক বছরে কোন নেতা, জনপ্রতিনিধিদের সম্পত্তি ফুলেফেঁপে ঢোল হয়েছে তার তালিকা ইতিমধ্যেই তৈরি করে ফেলেছে পিকের টিম। সূত্রের খবর, সেই তালিকায় যাঁদের নাম আছে তাঁদের দ্রুত কলকাতায় ডাকা হবে। সেখানেই দেওয়া হবে কড়া দাওয়াই। পিকের টিমের তালিকায় জেলার এক পদস্থ যুব নেতা, কাউন্সিলারের নাম রয়েছে। তালিকার প্রথম দিকেই রয়েঠে দিনহাটার বেশ কয়েজন জনপ্রতিনিধির নাম, তাঁদের মধ্যে একজন দিনহাটা-২ ব্লকের তৃণমূল পরিচালিত একটি গ্রাম পঞ্চায়েচের প্রধান। রিপোর্ট বলছে, ২০১৮ সালের পঞ্চায়েত নির্বাচনে জিতে ক্ষমতা দখলের পর গত দুই বছরে দিনমজুর থেকে একের পর এক বাড়ি, গাড়ি, ট্রাক, জমির মালিক হয়েছেন ওই নেতা। দলের এক বিধায়কের ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত ওই গ্রাম পঞ্চায়ে প্রধানের সম্পত্তির তালিকা দেখে পিকের টিম সদস্যদের চক্ষু চড়কগাছ হয়ে গিয়েছে। তৃণমূলের কোচবিহারের দুই কাউন্সিলারের সম্পত্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে পিকের টিম। ওই দুই কাউন্সিলারের একজন ইতিমধ্যেই বাড়ির পাশে বিশাল চারতলা মার্কেট কমপ্লেক্স তৈরি করেছেন। আরেকজন তিনতারা হোটেলের কাজ শুরু করেছেন বলে জানতে পেরেছে পিকের টিম। দুই কাউন্সিলারের নামে-বেনামে বহু সম্পত্তির হদিস মিলেছে। কোচবিহার-১ পঞ্চায়েত সমিতির দুই সদস্যের সম্পত্তি দেখে হতবাক হয়ে গিয়েছে পিকের টিম। ওই দুই সদস্যের একজন ছিলেন পেশায় কল সারাইয়ের মিস্ত্রি, অন্যজন টাইলস মিস্ত্রি। জনপ্রতিনিধি হওয়ার পর দুজনেরই জীবনয়াপনে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। দুজনেই এখন দামি গাড়ি নিয়ে ঘোরেন। সেই ছবি এবং ভিডিও সংগ্রহ করেছে টিম পিকে। তাদের মতে, দিনহাটা-২ ব্লকের এক জেলা পরিষদ সদস্যের ফুলেফেঁপে ওঠা সম্পত্তিও তৃণমূলের মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পেশায় স্কুলের ক্লার্ক ওই সদস্য আগে পুরোনো স্কুটার নিয়ে ঘুরতেন। এখন চলেন দামি গাড়িতে। তাঁর স্ত্রীও জনপ্রতিনিধি। তাঁদের দুই মেয়ে সরকারি চাকরি হয়েছে। দিনহাটা-১ পঞ্চায়েত সমিতির এক সদস্যের বিরুদ্ধে নামে-বেনামে বহু সম্পত্তি করার অভিযোগ উঠেছে। তাঁর স্ত্রীও জনপ্রতিনিধি। পেশায় প্রাথমিক স্কুলের শিক্ষক ওই জনপ্রতিনিধি আগে সাইকেল চালাতেন। এখন কালো রংয়ের দামি গাড়িতে ঘোরেন। মাথাভাঙ্গার এক নেত্রীর নাম পিকের তালিকায় আছে। কোচবিহার শহরে বিশাল জমি ছাড়াও ওই নেত্রীর বহু সম্পত্তির হদিস পেয়েছে পিকের টিম। নেতা-নেত্রীদের হাতে অবৈধভাবে টাকা পৌঁছানোর রাস্তা বাতলে দেওয়ার অভিযোগে জেলার একাধিক আমলা, গ্রাম পঞ্চায়ে সচিব, পুরসভা, জেলা পরিষদের আধিকারিকের নামও তৃণমূল নেত্রীর কাছে পাঠানো হচ্ছে। সরকারি কর্মীদের তালিকায় কোচবিহার পুরসভার এক ওভারসিয়ারের নাম আছে। দুর্নীতির দায়ে ইতিমধ্যেই জেল খেটে আসা ওই অস্থায়ী কর্মীর আয়ের সঙ্গে সঙ্গতিহীন বহু সম্পত্তির হদিস পেয়েছে পিকের টিম। নানা দুর্নীতির ব্লু প্রিন্ট তৈরিতে ওই কর্মীর হাত রয়েছে বলে অভিযোগ।

- Advertisement -