বাবার করোনা, ছাদনাতলা থেকে সোজা কোয়ারান্টিনে ছেলে-বউমা

প্রকাশ মিশ্র, মানিকচক : একমাত্র ছেলে। রবিবার সন্ধ্যায় ছিল ছেলের বিয়ের অনুষ্ঠান। পাত্রপাত্রী দুই পক্ষে কার্যত সাজো সাজো রব। বরযাত্রী যাওয়ার প্রস্তুতিও সম্পন্ন। কিন্তু সব ভেস্তে দিল পাত্রের বাবার লালা পরীক্ষার রিপোর্ট। ফলাফলে জানা গেল বাবা করোনা পজিটিভ। ফলে মানিকচকের মথুরাপুরের এক কর্মকার পরিবারের একমাত্র ছেলের বিয়ে ও বৌভাতের অনুষ্ঠান তছনছ হয়ে গেল। রিপোর্ট পজিটিভ হওয়ায় মাথায় হাত পাত্রপাত্রী দুইপক্ষের পরিবারসুদ্ধ আমন্ত্রিত আত্মীয়-স্বজন ও অতিথিদের। কয়েক ঘণ্টার প্রস্তুতিতে পরদিন সকালে নিয়ম রক্ষার বিয়ে হল সিঁদুরদান। তবে বাতিল করতে হল বৌভাতের অনুষ্ঠান। প্যান্ডেলের এককোণে পড়ে রইল পাত পেড়ে খাওয়ার টেবিল, চেয়ার, রান্নার, বাসনকোসন প্রভতি। পাত্রের বাবাকে নিয়ে রাখা হয়েছে মানিকচকের মথুরাপুর মডেল স্কুলের সেফ হোমে। হানিমুনের বদলে পাত্রপাত্রী চলে গেলেন হোম কোয়ারান্টিনে।

একমাত্র ছেলের বিয়ে করোনা রিপোর্ট পজিটিভ আসায় যে লন্ডভন্ড হয়ে যাবে, এমনটা হয়তো স্বপ্নেও ভাবতে পারেননি কর্মকার পরিবার। ছেলের বিয়ে আগে লালা পরীক্ষা করার পরিকল্পনাও ছিল না। তাঁদের ওই ব্যাংককর্মীর কিংবা পরিবারের অন্য সদস্যদের করোনার কোনও লক্ষণ ছিল না। অনেকটা বাধ্য হয়ে পরিবারের প্রত্যেককে টেস্ট করাতে হয়েছিল। বিষয়টা জানা গেল পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকেই। বছর ষাটের পাত্রের বাবা মথুরাপুরের একটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের কর্মী। মথুরাপুরের মানিকচক রাজ্য সড়কের ধারে এই ব্যাংকে কয়েকদিন আগেই করোনা সংক্রামিত হন খোদ ব্যাংকের ম্যানেজার। ঘটনায় রীতিমতো হুলুস্থুল পড়ে যায়। ওই দিনই শাখার রিজিওনাল অফিসের নির্দেশে কিছুদিনের জন্য ব্যাংক সিল করে দেওয়া হয়। ব্যাংক স্যানিটাইজের কাজও চলতে থাকে। পুনরায় কাজে যোগ দেওয়ার আগে ব্যাংকের প্রত্যেক কর্মীকে লালা পরীক্ষার নির্দেশ দেয় কর্তৃপক্ষ।

- Advertisement -

এই কারণে লালা পরীক্ষা করান ওই কর্মী এবং তার পরিবার। ছেলের বিয়ে কারণে মানিকচকের বিএমওএইচ হেম নারায়ণ ঝার উদ্যোগে দ্রুত লালা সংগ্রহ করা হয়। শনিবার রাতে নমুনা পরীক্ষার ফলাফল জানা যায়। পরিবারের সকলে নেগেটিভ হলেও একমাত্র ব্যাংককর্মী বাবার করোনা সংক্রমণ ধরা পড়ে। তাঁর সঙ্গে ওই ব্যাংকের আরো একজন পদস্থ কর্মীর সংক্রমণ ধরা পড়ে। এই খবরে কার্যত মাথায় বাজ পড়ে দুই পক্ষেরই। কেননা বিয়ের সমস্ত আয়োজন এখন সম্পন্ন। আমন্ত্রিতদের নেমন্তন্ন সম্পূর্ণ। বৌভাতের অনুষ্ঠানের খাওয়াদাওয়ার মেনু সহ আয়োজনে কোনও ত্রুটি রাখেননি কর্মকার পরিবার। একমাত্র ছেলের বিয়ে বলে কথা। বাড়ি ভর্তি আমন্ত্রিত লোকজন। এরই মধ্যেই আসে করোনা দুঃসংবাদ।

পাত্র রীতিমত মেধাবী ছাত্র। ডব্লিউবিসিএস প্রিলিমিনারি এবং মেইন পরীক্ষায় পাস করেছেন। এখন শুধু ডাকের অপেক্ষায়। পাত্রীও প্রতিষ্ঠিত। উত্তর মালদার একটি ব্লকের স্বাস্থ্যকর্মী। বাড়ি ইংরেজবাজারের একটি গ্রামে। পাত্র বলেন, বাবার করোনা সংক্রমণের ফলাফল নিয়ে আমরা রীতিমতো উৎকন্ঠায় ছিলাম। যদিও বাবার শরীরে রোগের কোনও লক্ষণ ছিলনা। আমি বাবার করোনা সংক্রমণের খবরটা শনিবার রাতে জানতে পারি। সঙ্গে সঙ্গে দুই পরিবারের অভিভাবককে নিয়ে বসা হয় বসে তড়িঘড়ি একটা সিদ্ধান্ত নেওয়া দরকার। এই পরিস্থিতিতে কী করা যায় তা নিয়ে আলোচনা হয়। বাবা-মার আশীর্বাদ বলে একটা কথা আছে। আমরা সকলে মিলেই সিদ্ধান্ত নিই। সন্ধ্যায় বিয়ে অনুষ্ঠান বাতিল করে নমো নমো করে সকালে বিয়ে সেরে ফেলা হবে বলে সিদ্ধান্ত হয়। কেন না সকাল হলেই রয়েছে স্বাস্থ্য দপ্তর এবং পুলিশের ঝক্কি ঝামেলার ব্যাপার।

তাঁর কথায়, করোনা সংক্রামিত বাবাকে নিয়ে টানাটানি। দেরি হলেই পুলিশের গাড়ি হয়তো এসে পড়বে বাবাকে মডেল মাদ্রাসায় আইসোলেশন সেন্টারে নিয়ে যাওয়ার জন্য। তাই আর আমরা কোন রকম ঝুঁকি নিইনি। সকাল সাতটার মধ্যে নিয়ম রক্ষার বিয়ে সেরে ফেলেছি। সিঁদুরদান নিয়ম মেনেই হয়। পরিবারের সকলে মাস্ক পড়েছিলেন। দূর থেকে বাবা-মা আশীর্বাদ করেছেন। বাবা সেফ হোমে। পরিবারে আমরা যেহেতু রয়েছি, তাই আমাদেরও হোম কোয়ারান্টিনে থাকতে হবে। সোমবার ছিল বৌভাতের অনুষ্ঠান। প্রীতিভোজের আয়োজন ছোটখাটো করে করা হয়েছিল। সবই পড়ে রইল। বৌভাতের অনুষ্ঠান বাতিল করা হয়েছে। রাতারাতি আত্মীয়-স্বজনকে বৌভাতের অনুষ্ঠান বাতিলের কথা জানানো হয়। সন্ধ্যায় বরযাত্রী যাওয়ার জন্য আমন্ত্রিতদের বাড়িতে আসার কথা ছিল। বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজন প্রত্যেককে বারণ করে দেওয়া হয়। এ ছাড়া কোনও উপায় ছিল না।

পাত্রের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল, তাহলে বৌভাত আবার কবে হবে? পাত্র জানায়, করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত আর বৌভাতের অনুষ্ঠান করছি না। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে প্রথম বিবাহবার্ষিকীতে ওই অনুষ্ঠান করা হবে। স্বাভাবিকভাবেই পাত্রপাত্রীর হানিমুনের আর কোনও গল্প নেই। পরিবারের সকলেই ছাদনাতলা থেকে সরাসরি হোম কোয়ারান্টিনে।