বালুরঘাটে ছেলের উদ্যোগে মায়ের চোখ, দেহদান

পঙ্কজ মহন্ত, বালুরঘাট : বালুরঘাটের মতো একটি প্রান্তিক শহরে থেকেও মায়ের মরণোত্তর চক্ষুদান এবং দেহদান করে নজির গড়লেন এক স্কুল শিক্ষক। বালুরঘাট শহরের বেলতলা পার্ক এলাকার দুর্গাবাড়ির বাসিন্দা স্কুল শিক্ষক বিভাস দাসের মা অঞ্জলি দাস মঙ্গলবার সকালে মারা যান। এরপরেই ছেলে বিভাস দাসের তৎপরতায় মৃত বালুরঘাটের স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা প্রয়াস আত্রেয়ীতে অঞ্জলিদেবীর চক্ষুদান করা হয়। চক্ষুদানের পরেই বিভাসবাবু নিজ উদ্যোগে মায়ের দেহ মালদা মেডিকেল কলেজে নিয়ে যান। সেখানে অঞ্জলিদেবীর দেহদান করা হয়।

এই বিষয়ে পেশায় প্রাথমিক শিক্ষক বিভাস দাস জানান, ২০১৭ সালে বাবার মৃত্যুর পরে মায়ের স্নায়ুর সমস্যা দেখা দেয়। তারপর বহু স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হই। বিভিন্ন জায়গায় মায়ের চিকিৎসা করা হয়। আলিপুর হাসপাতাল থেকে শুরু করে লখনউ হাসপাতালে মায়ের চিকিৎসা চলে। স্নায়ুরোগের কবলে পড়ে দীর্ঘ দুবছর রীতিমতে শয্যাশায়ী ছিলেন। মঙ্গলবার সকাল আটটা নাগাদ মায়ের মৃত্যু হয়। বালুরঘাটের প্রয়াস আত্রেয়ীতে ২০১১ সালে আমি ও মা মরণোত্তর চক্ষুদানের অঙ্গীকার করেছিলাম। যথারীতি মায়ের মৃত্যুর পরে দেরি না করে ওই সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ করি। সংস্থার তরফে চিকিৎসক রামেন্দু ঘোষ ও তার দুজন সহকারী মিলে দক্ষতার সঙ্গে মায়ের দুটো কর্নিয়া সংগ্রহ করেছেন। মঙ্গলবারে তা সংগ্রহ করে কলকাতায় পাঠানো হয়েছে। সেখানে দুজন জন্মান্ধ ব্যক্তির চোখের সেটা প্রতিস্থাপন করা হবে।

- Advertisement -

তিনি জানান, ২০১৩ সালে তাঁরা দুজনেরই মরণোত্তর দেহদানের অঙ্গীকার করেছেন। বিভাসবাবু বলেন, সেই অনুয়ায়ী মায়ের মৃত্যুর পরে আমরা মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক সুকুমার দের মাধ্যমে মালদা মেডিকেল কলেজে ও হাসপাতালে যোগাযোগ করি। ওই হাসপাতালের সহ অধ্যক্ষ প্রমিতকুমার লাহা, হাসপাতালের সুপার সৌনভ ঘোষ ও ডেপুটি সুপার চন্দন মল্লিক আমাদের সাহায্য করেন। তাদের তত্ত্বাবধানে মালদা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের অ্যানাটমি বিভাগে মায়ের দেহদান করি। মায়ের দেহটাকে পুড়িয়ে নষ্ট না করে যাতে চিকিৎসাবিজ্ঞানের কাজে লাগতে পারে এবং আগামীর চিকিৎসকরা তা নিয়ে গবেষণা করে সুযোগ্য চিকিৎসক হয়ে উঠতে পারে তার জন্যই মায়ে দেহদান করেছি। মাতৃহারা অবস্থায় চাপা দুঃখের সঙ্গে একটা আনন্দের অনুভুতিও হচ্ছে এই ভেবে যে মৃত্যুর পরেও মায়ের দেহ চিকিৎসাবিজ্ঞানে কাজে লাগবে।

প্রয়াস আত্রেয়ীর সভাপতি তথা চিকিৎসক রামেন্দু ঘোষ জানান, বিভাসবাবুর মা অঞ্জলিদেবীর সম্মতিতেই মরণোত্তর চক্ষুদান করা ছিল। মৃত্যুর পরে তাঁর সন্তান ও নিকট আত্মীয়রা চক্ষুদান কার্যকর করার জন্য যোগাযোগ করেন। বিষয়টি আমাদের ফোনে জানানো হলে আমরা তিনজন তৎক্ষণাৎ সংস্থায় যাই। মৃত্যুর ছয় ঘণ্টার মধ্যে আমরা মৃত ব্যক্তির কর্নিয়া সংগ্রহ করতে পারি। আমরা বারোটা নাগাদ অঞ্জলিদেবীর দুটো কর্নিয়া সংগ্রহ করি। সেই কর্নিয়া সংগ্রহ করে আমরা একটি মিডিয়াতে সংরক্ষণ করি। সেটা ৯৬ ঘণ্টার মধ্যে অন্ধ ব্যক্তিকে প্রতিস্থাপন করতে হয়। সেই অনুয়াযী মঙ্গলবার আমরা কলকাতা মেডিকেল কলেজের রিজিওনাল ইনস্টিটিউট অপথ্যালমোলজিতে পাঠাই। বুধবার দুপুরে অস্ত্রপচারের পর দুজন অন্ধ ব্যক্তি ওই কর্নিয়ার দ্বারা দৃষ্টি ফিরে পেয়েছেন। কিন্তু নিয়ম অনুয়ায়ী কাকে চোখ দান করা হল সেটা প্রকাশ করা হয় না।