ইচ্ছার জোরে চাষির ছেলে আজ লেফটেন্যান্ট

153

শুভজিৎ দত্ত, নাগরাকাটা : ইংরেজিতে একটি চালু প্রবাদবাক্য হল হোয়্যার দেয়ার ইজ এ উইল, দেয়ার ইজ এ ওয়ে। বাংলায় তর্জমা করলে দাঁড়ায়- ইচ্ছা থাকলে উপায় হয়। ইস্পাতকঠিন ওই ইচ্ছেটাই সম্বল ছিল লুকসানের চাষির ছেলে জ্ঞানেন্দ্র ছেত্রীর। তার জোরেই আজ তিনি সেনা অফিসার। দেরাদুনের ইন্ডিয়ান মিলিটারি অ্যাকাডেমি থেকে লেফটেন্যান্ট হয়ে জ্ঞানেন্দ্র এখন গোটা ডুয়ার্সের গর্ব। গত রবিবার বাড়ি ফিরে আসার পর সংবর্ধনার জোয়ারে ভাসছেন তিনি। লাজুক ও নম্র জ্ঞানেন্দ্র বলেন, ছোটবেলা থেকেই ইচ্ছা ছিল সেনাবাহিনীর অফিসার হব। তা পূরণ হওয়ায় খুব ভালো লাগছে।

জ্ঞানেন্দ্রর জীবনে উত্তরণের রাস্তাটি আদৌ মসৃণ ছিল না। প্রথমে তিনি ন্যাশনাল ডিফেন্স অ্যাকাডেমিতে সুযোগ পাওয়ার পরীক্ষায় অকৃতকার্য হন। ভেঙে পড়েননি। ২০১২ সালে সেনাবাহিনীর সিপাই পদে যোগ দেন। তবে পাখির চোখ ছিল অফিসার হওয়া। ২০১৭-তে ওই পদে থেকেই অফিসার কমিশনিং পরীক্ষায় বসেন। এবার সাফল্য মেলে। এরপর দেরাদুনে শুরু হয় প্রশিক্ষণ। ৪ বছরের কঠোর তালিম পর্বের শেষে এখন তিনি লেফটেন্যান্ট পদমর্যাদার সেনা আধিকারিক। এরপর ঊর্ধ্বতন কর্তপক্ষের নির্দেশ মোতাবেক নয়া দায়িত্বে যোগ দেবেন।

- Advertisement -

জ্ঞানেন্দ্রর বাবা তিলক ছেত্রী পেশায় চাষি। সামান্য যা জমিজিরেত আছে তাতেই ফসল ফলিয়ে সংসার চালান। মা লীলা ছেত্রী আটপৌরে গৃহবধূ। দিদি শ্রীজনার বিয়ে হয়ে গিয়েছে। ছোট ভাই গোবিন ছেত্রী সেনায় সিপাই পদে কর্মরত। ছেলে সেনা অফিসার হয়ে বাড়ি ফিরে আসার পর মা-বাবার চোখে আনন্দাশ্রু। তিলকবাবু বলেন, খুব কষ্ট করে ওদের লেখাপড়া শিখিয়েছি। পড়ত লুকসানের স্কুলেই। এতদূর যাবে কখনও ভাবিনি। জ্ঞানেন্দ্রর জেদ দেখে অবশ্য বুঝতাম ও নিশ্চয় কিছু একটা করবে।

লুকসানের নন্দলাল সুব্বা স্মৃতি নেপালি স্কুল থেকে মাধ্যমিক পাশ  করার পর জ্ঞানেন্দ্র উচ্চমাধ্যমিক পাশ করেন শিলিগুড়ির আইবি থাপা নেপালি স্কুল থেকে। এরপর শিলিগুড়ি কলেজে প্রথম বর্ষে ভর্তি হওয়ার পরই সেনার সিপাই পদের পরীক্ষা দিয়ে চলে যান। এর পরের কাহিনী শুধুই ইতিহাস।

এই আকাশছোঁয়া সাফল্যের মাঝেও জ্ঞানেন্দ্রর আফসোস একটাই। গত ১২ জুন ইন্ডিয়ান মিলিটারি অ্যাকাডেমিতে যেদিন পাসিং আউট প্যারেড হয়, করোনা পরিস্থিতির কারণে সেদিন বাবা-মা হাজির থাকতে পারেননি। প্রথা মেনে ওই অনুষ্ঠানে বাবা-মায়েরাই তাঁদের সন্তানদের ইউনিফর্মে লেফটেন্যান্ট ব্যাজ লাগিয়ে দেন। নাগরাকাটার একলব্য মডেল স্কুলের অধ্যক্ষ মেজর অমরজিৎ সিং চৌহান বলেন, লুকসানের মতো ছোট্ট একটা জনপদ থেকে সেনার ওই পদে যাওয়াটা অবশ্যই একটি বিরাট বড় প্রাপ্তি। ওঁকে কুর্নিশ জানাই। রবিবার জ্ঞানেন্দ্র বাড়ি ফিরে আসার পর এলাকার বাসিন্দারা সংবর্ধনা দেন। স্থানীয় একটি স্কুলের অধ্যক্ষ মনোজ দাহাল বলেন, ও গোটা এলাকার কাছে একটি দৃষ্টান্ত।