গাজোলের মেয়ে সৌমিতা এখন পুরোদস্তুর ছেলে

গৌতম দাস, গাজোল : অবশেষে স্বপ্নপূরণ। সমাজ, পরিস্থিতি প্রতিকূল। কিন্তু সবকিছুকে পেছনে ফেলে লিঙ্গ পরিবর্তন করে গাজোলের সৌমিতা পরিণত হয়েছেন সিডে। ছোট থেকেই ছেলেদের মতো আচরণের কারণে অনেকের কাছে কটূক্তি শুনতে হয়েছে তাঁকে। তবে সমস্ত কিছুকে উপেক্ষা করেই নিজের ইচ্ছাশক্তির জোরে তিনি অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে লিঙ্গ পরিবর্তন করেছেন। ভবিষ্যতে ট্রান্সফর্মিং ফটোগ্রাফার হিসাবে নিজেকে তুলে ধরতে চান সিড। সিড জানান, বালুরঘাটের অ্যানি দত্ত তাঁর অনুপ্রেরণা। সম্প্রতি লিঙ্গ রূপান্তরের মাধ্যমে পুরুষ থেকে স্ত্রীতে পরিণত হয়ে মিস ইন্ডিয়ার সম্মানে ভূষিত হয়েছেন।

গাজোলের কচুয়া এলাকার বাসিন্দা সঞ্জীবন ঠাকুর এবং প্রতিমা ঠাকুরের মেয়ে সৌমিতা ঠাকুর। মেয়ে হলেও ছোট থেকেই তাঁর আচার আচরণ ছিল ছেলেদের মতো। এমনকি ছেলেদের পোশাক এবং তাদের সঙ্গে মেলামেশাতেই তিনি স্বচ্ছন্দ বোধ করতেন। স্থানীয় একটি বেসরকারি স্কুলে প্রাথমিকের গণ্ডি পার করার পর তিনি গাজোলের শ্যামসুখী বালিকা বিদ্যালয়ে ভর্তি হন। কিন্তু সহপাঠীদের কাছে নিয়মিত কটক্তি শুনতে হয়েছে তাঁকে। এমনকি পথেঘাটেও অনেকে তাঁকে নানাভাবে অপমান করেছে। স্কুলের পড়াশোনা শেষ করার পরে দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার একটি কারিগরি কলেজে ভর্তি হন। কিন্তু গঞ্জনা তাঁর পিছু ছাড়েনি। ক্রমাগত অপমানিত হতে থাকায় শেষ পর্যন্ত তিনি মেয়ে থেকে ছেলেতে রূপান্তরিত হওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। তাঁর এই সিদ্ধান্ত প্রথমে বাড়ির লোকেরা মত না দিলেও পরে অবশ্য তাঁরা রাজি হয়ে যান। নিজের এক দিদির মাধ্যমে বালুরঘাটের অ্যানি দত্তের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ হয়। শুরু হয় চিকিৎসকদের সঙ্গে যোগাযোগ। শেষে গত ডিসেম্বর মাসে কলকাতার একটি নার্সিংহোমে জটিল অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সৌমিতা পরিণত হন সিডে।

- Advertisement -

সিডের বাবা সঞ্জীবন ঠাকুর বলেন, ছোটবেলা থেকেই ওর আবদার ছেলেদের পোশাক। ছেলেদের খেলাধুলোর বিভিন্ন সরঞ্জাম। কোনওমতে নার্সারি স্কুল পার হলেও যখন ও শ্যামসুখী স্কুলে ভর্তি হয়, তখন থেকেই স্কুলের প্রতি অনীহা দেখা দেয়। রাস্তা দিয়ে চলতে গিয়ে ওকে নানা কটূক্তির মুখোমুখি হতে হয়েছে। অনেকসময় তার প্রতিবাদও করেছি। শেষে ও যখন সার্জারির কথা বলল কিছুটা হলেও অবাক হয়ে গিয়েছিলাম। কিন্তু ওর ইচ্ছাশক্তিকে সম্মান জানিয়েছি আমি। সিডের মা প্রতিমাদেবী জানান, সারাজীবন চেয়েছি আমাদের একটা ছেলে হোক। সৌমিতার সিড হয়ে ওঠায় নিজের আত্মা শান্তি পেয়েছে। আমাদের মনের ইচ্ছা পূর্ণ হয়েছে। এতদিন আমাদের কোনও ছেলে ছিল না।

সৌমিতা ঠাকুর ওরফে সিড ঠাকুর জানান, সৌমিতা থেকে সিড হওয়ার পিছনে অনেক গল্প জড়িয়ে আছে। ছোটবেলা থেকেই ছেলেদের সঙ্গে ঘোরাফেরা, খেলাধুলোতেই স্বচ্ছন্দ বোধ করতাম। ছেলেদের পোশাক ছাড়া অন্য কিছু আমার ভালো লাগত না। কিন্তু যখন একটু বড় হলাম, তখন সমাজের মানুষের কটক্তি সহ্য করা যেত না। সেই সময়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, এই শরীর আমার জন্য ঠিক নয়। স্কুলে যেতে ভালো লাগতো না। কারণ স্কুলে গেলেই আমাকে নিয়ে হাসিঠাট্টা করত বান্ধবীরা। তাই অনেক কষ্ট করে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক দেওয়ার পর আমি দক্ষিণ দিনাজপুরে ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে ভর্তি হলাম। কিন্তু সেখানেও আমাকে কটূক্তি করা শুরু হয়।

সিডের কথায়, আমার পাশে সেরকম কাউকে পাইনি। সবসময় শুধু আমার পাশে থেকেছে আমার বাবা, মা এবং দিদি। এরপরে আমি দিদির সঙ্গে কথা বলি এবং আমার সঙ্গে পরিচয় হয় বালুরঘাটের অ্যানি দত্তের। তাঁর সঙ্গে কথা বলার পর আমি সিদ্ধান্ত নিই, আমি সৌমিতা থেকে সিড হয়ে উঠব। নিজের ইচ্ছার কথা পরিবারের কাছে জানাই। প্রথমে বিরুদ্ধে থাকলেও পরবর্তীতে সেই ইচ্ছাকে মেনে নিয়েছে আমার পরিবার। এরপরে সার্জারি করার সময় নানা সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়েছে আমাকে। অবশেষে ডিসেম্বর মাসের শেষে সার্জারি করার পর এখন আমি পরিপূর্ণ যুবক। আগামীদিনে নিজের স্বপ্নকে বাস্তব করাই আমার লক্ষ্য।