হেরে গেলেন অপরাজিতের ‘অপু’

443

কলকাতা: দীর্ঘ চল্লিশ দিনের লড়াই শেষ। হেরে গেলেন অপরাজিতের ‘অপু’। রবিবার দুপুরে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন ৮৬ বছরের প্রবীণ অভিনেতা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। তাঁর প্রয়াণে এক বিরাট শূন্যতা তৈরি হল বাংলা সিনেমা জগতে।

১৯৩৫ সালের ১৯ জানুয়ারি কলকাতার মির্জাপুর স্ট্রিটে জন্ম হয় সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের। ডাকনাম ছিল পুলু। প্রথম ১০ বছর কৃষ্ণনগরে পৈতৃক বাড়িতেই কাটান তিনি। বাবা ও পিতামহ কৃষ্ণনগরে নাট্যচর্চার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, যা ছোট্ট সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের জীবনে প্রভাব ফেলেছিল। স্কুলের নাটকেই তিনি অভিনয় শুরু করেন। প্রথমে কৃষ্ণনগরের স্কুল ও পরে হাওড়া জিলা স্কুলে পড়াশোনা তাঁর। পরে তিনি সিটি কলেজে ভর্তি হন। বাংলা সাহিত্যে বিএ পাশ করেন। এরপর বাংলা নিয়েই কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করেন এমএ।

- Advertisement -

সৌমিত্রবাবু প্রথম জীবনে অল ইন্ডিয়া রেডিওর ঘোষক হিসাবে কাজ শুরু করেন। কলেজ জীবনের শেষদিকে প্রথমে অহীন্দ্র চৌধুরি ও পরে শিশিরকুমার ভাদুড়ির সংস্পর্শে এসে অভিনয়কেই পেশা হিসেবে বেছে নেবেন বলে ঠিক করেন। শিশিরকুমারের প্রযোজনায় কিছু নাটকে অভিনয় করেন। সত্যজিৎ রায় অপরাজিত ছবির অপুর জন্য মুখ খুঁজছেন জানতে পেরে, তাঁর সঙ্গে দেখা করেন সৌমিত্রবাবু। কিন্তু বয়স বেশি হওয়ায় বাতিল হয়ে যান। দু’বছর পর, সত্যজিতেরই অপুর সংসার দিয়ে সিনেমার কেরিয়ার শুরু। তারপর আর ফিরে তাকাতে হয়নি। শুধুমাত্র সত্যজিৎ রায়ের ১৪টি সিনেমায় অভিনয় করেছিলেন। এছাড়া মৃণাল সেন, তপন সিনহা সহ বাংলার প্রায় সব পরিচালকের সঙ্গে কাজ করেছেন সৌমিত্রবাবু। মহানায়ক উত্তমকুমারের সঙ্গে একাসনে নিজেকে বসিয়ে ফেলেছেন পর্দার ‘ফেলুদা’।

১৯৬১ সালে নির্মাল্য আচার্যের সঙ্গে সৌমিত্রবাবু প্রকাশ করেন ‘এক্ষণ’ পত্রিকা। সিনেমার নায়ককে অন্যরূপে চিনল বাঙালি। পরে কবি সৌমিত্র, প্রাবন্ধিক সৌমিত্রকেও চিনেছে বাংলা। তাঁর লেখা বইয়ের মধ্যে অন্যতম মানিকদার সঙ্গে, পরিচয়, অগ্রপথিকেরা, প্রতিদিন তব গাঁথা, মধ্যরাতের সংকেত অন্যতম। এছাড়া অজস্র নাটক তো আছেই।

সিনেমায় কেরিয়ার শুরু করার পর প্রায় কুড়ি বছর পর ফের নাট্যমঞ্চে ফেরেন সৌমিত্রবাবু। ১৯৭৮ সালে অভিনয় করলেন তাঁরই লেখা নাটক নামজীবন-এ। এরপর একে একে রাজকুমার, ফেরা, নীলকণ্ঠ, ঘটক বিদায়, ন্যায়মূর্তি, টিকটিকি, হোমাপাখি-তে অভিনয়। ২০১০ সাল পর্যন্ত নিয়মিত নাটক করেছেন তিনি। তাঁর শেষ অভিনীত নাটক সুমন মুখোপাধ্যায় পরিচালিত রাজা লিয়ার।

সৌমিত্রবাবুর পদ্মভূষণ, পদ্মশ্রী, সঙ্গীত নাটক একাডেমি পুরস্কার, দাদাসাহেদ ফালকে পুরস্কার পেয়েছিলেন। পাশাপাশি, ফ্রান্সের সর্বোচ্চ সম্মান লিজিয়ঁ দে অনার পুরস্কারও পেয়েছিলেন তিনি। ফরাসি সরকারের সংস্কৃতি দপ্তরের তরফে এই বিশেষ পুরস্কার দেওয়া হয় অভিনেতাকে। তিনি চারবার জাতীয় পুরস্কার, আটবার বিএফজেএ ও চারবার ফিল্মফেয়ার অ্যাওয়ার্ড পেয়েছিলেন তিনি।