সৌমিত্র বললেন, সংসার চালাতে কত টাকা লাগে জানো?

অনুপ দত্ত : সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। ছোটবেলায় দাদুর মুখে প্রথম শুনেছিলাম তাঁর প্রিয় নায়কের নাম। বড় হয়ে যখন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের ছবি দেখেছি, বুঝেছিলাম কেন দাদুর প্রিয় নায়ক। তাঁর সাক্ষাৎকার নেব? ভাবতেই শরীরে যেন বিদ্যুতের শক। দিনদুয়েক সেই জল্পনা চলছিল মনের মধ্যে।

সালটা ২০০২। সত্যজিৎ রায়ের অরণ্যের দিনরাত্রি ছবির দ্বিতীয় পর্ব। দীর্ঘদিন বাদে ছবি করছিলেন পরিচালক গৌতম ঘোষ। ছবির নাম আবার অরণ্যে। সেই ছবির শুটিং হয়েছিল আলিপুরদুয়ারে। যথারীতি ছবির অন্যতম চরিত্রে সৌমিত্র। আলিপুরদুয়ারে সাতদিনের শুটিং। শহর থেকে দূরে চা বাগান, পাহাড় আর জঙ্গলে লাইট-ক্যামেরা-অ্যাকশন। লোকেশনে সাংবাদিকদের যাওয়ার অনুমতি থাকলেও, ওই স্পটে ছবি তোলা বা অভিনেতাদের সাক্ষাৎকার নেওয়ায় নিষেধ ছিল। আমরা রোজই শুটিং লোকেশনে আলিপুরদুয়ার থেকে কালচিনি, রাজাভাতখাওয়া যেতাম। কিন্তু সাক্ষাৎকার নেওয়ার সময় পাওয়া যাচ্ছিল না। আলিপুরদুয়ার প্যারেড গ্রাউন্ডের কাছে গেস্টহাউসে সৌমিত্রবাবু, শুভেন্দু চট্টোপাধ্যায়, শমিত ভঞ্জের থাকার ব্যবস্থা হয়েছিল। অনেক চেষ্টাচরিত্র করে চারদিন পরে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের সাক্ষাৎকারের সময় পাওয়া গেল। দিনটা ছিল শুক্রবার। নতুন ছবির মুক্তির দিন। সকাল থেকে মনের ভিতর উথালপাতাল উত্তেজনা। এতবড় অভিনেতা। তাঁর সাক্ষাৎকার নেব! কী প্রশ্ন করব, কী করা যায়! এর মধ্যে দু-একটি পত্রিকার পাতাও উলটেছি। ফিল্ম স্টারদের সাক্ষাৎকার ঠিক কেমন নেওয়া হয় এসব জানতে। কয়েকটি প্রশ্ন সাজিয়ে নিয়ে ঠিক সাড়ে ১২টা নাগাদ পৌঁছে গেলাম গেস্টহাউসে। সঙ্গে ক্যামেরা আর ছোট্ট টেপ রেকর্ডার। তখন তো মোবাইল ফোন ছিল না।

- Advertisement -

বারান্দায় চেয়ারে বসে সৌমিত্র। একটু দূরে দাঁড়িয়ে শুভেন্দু চট্টোপাধ্যায়। কাছে যেতেই সামনে রাখা চেয়ারে বসতে বললেন সৌমিত্রবাবু। উত্তেজনা তখন এতটাই চরমে পৌঁছেছিল যে, চেয়ারে বসতে গিয়ে সৌমিত্রবাবুর হাঁটুর সঙ্গে আমার হাঁটুর ধাক্কা লেগে যায়। আগে থেকেই সৌমিত্রবাবুকে বেশ গম্ভীর দেখাচ্ছিল। আমি ভাবলাম এই মরেছে, এবার উনি রেগে গিয়ে আমাকেই না বলে বসেন, সাক্ষাৎকার দেব না। আমার হাত-পা কাঁপছিল। কিন্তু না, সৌমিত্রবাবু স্থির হয়ে বসে রইলেন। বিষয়টি টের পেয়ে শুভেন্দু বললেন, আরে ঠিক আছে। বোসো বোসো।

নিশ্চিন্ত হলাম। আগেভাগে তৈরি করা প্রশ্নগুলো সব তালগোল পাকিয়ে গেল। সেই মুহূর্তে বিস্মৃতি পেয়ে বসেছে। শুধু মনে হচ্ছে, আমার দাদুর নায়ককে এত কাছ থেকে দেখছি! মুখ দিয়ে কোনও কথাই বার হচ্ছিল না। সেটা বোধহয় সৌমিত্রবাবু বুঝতে পেরেছিলেন। তাই নিজেই নীরবতা ভেঙে খুব গম্ভীরভাবে বললেন, কী প্রশ্ন করবেন? এতদিন পরে কেন আবার অরণ্যে ছবিতে? কেমন লাগছে? সাহস পেলাম। কাঁপা গলাতেই বললাম, এটাই বলতে চাইছিলাম। খুবই কাট কাট উত্তর দিলেন সৌমিত্র। বললেন, মানিকদার ছবির সঙ্গে এই ছবির তুলনা ঠিক নয়। দুটো জেনারেশন। মাঝে অনেকটা গ্যাপ। ভালোই লাগছে। -উত্তর শেষ। তখনকার বাংলা ছবি আর এখনকার বাংলা ছবি- গতানুগতিক এক প্রশ্ন মুখ ফসকে বেরিয়ে গেল। সৌমিত্রবাবু শান্ত গলায় বললেন, কেন, আজকাল তো অনেক ভালো ছবি হচ্ছে। এত রে-রে করার কী আছে?

এরপর একের পর এক প্রশ্ন আর উত্তর, কখন সময়ে ঘড়ি ঘণ্টা পেরিয়ে গিয়েছে খেয়াল নেই। শেষমেশ সেই প্রশ্নটা করেই ফেললাম। আচ্ছা, আমরা যে সৌমিত্রকে জাতীয়-আন্তর্জাতিক অভিনেতা হিসাবে চিনি-জানি, তাঁকে এত সস্তা ছবিতে দেখা যায় কেন? সৌমিত্র ইমেজে ধাক্কা খায় না? আরও গম্ভীরভাবে সৌমিত্রবাবু বললেন, সংসার চালাতে কত টাকা লাগে সেটা জানো?

এতক্ষণ সৌমিত্রবাবু আমাকে আপনি করে সম্বোধন করছিলেন। এবার জানো বলায় বুঝতে পারলাম, সঠিক জায়গায় প্রশ্নটা ছোড়া হয়েছে। সৌমিত্রবাবু বললেন, আর্ট ফিল্ম কি আমায় সেই পয়সা দেয়? বাজারি সস্তা ছবি না করলে পেট চলবে? অতএব এসব ছবি আমাদের করতে হয়। শেষ প্রশ্ন ছিল, আপনার প্রায় সব কবিতায় নূপুর শব্দটা ঘুরে ফিরে আসে, কেন? আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়লেন সৌমিত্র। বললেন, আমার মেয়ে নাম নূপুর। তাই, আমার কবিতায় বারবার নূপুর শব্দটা ঘুরে ফিরে আসে।