সাহেবদের ইংরেজি শেখাচ্ছেন আলিপুরদুয়ারের সৌরিত

340

ভাস্কর শর্মা, আলিপুরদুয়ার : নকশালবাড়ি আন্দোলন থেকে বাংলার দুর্ভিক্ষ। খাদ্যসংকট থেকে ইন্দিরা গান্ধির জরুরি অবস্থা। পাশাপাশি ব্রিটিশরা কী নির্মমভাবে এই দেশকে শাসন করেছে তার বিস্তারিত ব্যাখ্যা খোদ ইংল্যান্ডে বসেই সাদা চামড়ার সাহেবদের শোনাচ্ছেন আলিপুরদুয়ারের যুবক সৌরিত ভট্টাচার্য। সৌরিত ব্রিটেনের গ্লাসগো বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি সাহিত্যের অধ্যাপক। অধ্যাপনার পাশাপাশি তিনি নানা বিষয়ে গবেষণাও করছেন। গবেষণা এবং তাঁর লেখা বই বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ইতিহাসবিদদের মধ্যেও আলোড়ন ফেলে দিয়েছে। সংকটময় পরিস্থিতিতে ব্রিটিশ সরকার কীভাবে কাজ করেছে সে বিষয়ে গবেষণার জন্য সম্প্রতি স্কটল্যান্ডের একটি সংগঠন ওই যুবককে সম্মান জ্ঞাপনও করেছে। স্বাভাবিকভাবেই খোদ ইংল্যান্ডে গিয়ে সেখানকার বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়াদের ইংরেজি শেখানো সহ ওই যুবকের অন্যান্য কৃতিত্বে খুশি আলিপুরদুয়ারের বাসিন্দারা।

সৌরিত আলিপুরদুয়ার শহরের কাঁঠালতলা এলাকার বাসিন্দা। বাবা সুশীল ভট্টাচার্য ভূমি সংস্কার দপ্তরে চাকরি করতেন। মা ছন্দাদেবী গৃহবধূ। ছোট থেকেই সৌরিত মেধাবী। স্থানীয় একটি প্রাথমিক স্কুলে পাঠ চুকিয়ে ভর্তি হন শহরের ম্যাকউইলিয়াম হাইস্কুলে। সেখান থেকে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিকে ভালো রেজাল্ট করে ইংরেজিতে অনার্স নিয়ে ভর্তি হন প্রেসিডেন্সি কলেজে। সেখান থেকে প্রথম বিভাগে পাশ করে সৌরিত ভর্তি হন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে এখানেই ইতিহাসের প্রতি, সাহিত্যের প্রতি, ভাষার প্রতি আরও আগ্রহ বাড়ে তাঁর। যাদবপুর থেকে এমএ করার সময় নেট পরীক্ষা দিয়ে উত্তীর্ণ হওয়ার পাশাপাশি জুনিয়ার রিসার্চ ফেলোশিপ পান তিনি। কিন্তু কলেজের অধ্যাপকের মৌখিক পরীক্ষায় ডাক পাওয়া সত্ত্বেও পিএইচডি করতে তিনি ব্রিটেনে চলে যান। ১৯৪০ থেকে ১৯৭০ সালে ভারতের ইতিহাস ও সাহিত্য এবং বাংলার দুর্ভিক্ষ, নকশালবাড়ি আন্দোলন থেকে ইন্দিরা গান্ধির সময়ে জরুরি অবস্থা নিয়ে গবেষণা করেন সৌরিত। ডক্টরেট ডিগ্রি পাওয়ার পরেও নানা বিষয় নিয়ে গবেষণা চালাতে থাকেন তিনি। এর মধ্যেই ব্রিটেনের গ্লাসগো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অধ্যাপনা করার ডাক আসে তাঁর। বর্তমানে প্রায় দেড় বছর ধরে সেখানেই ইংরেজি ভাষা সাহিত্যের অধ্যাপক হিসেবে সাহেবদের পড়াচ্ছেন আলিপুরদুয়ারের যুবক সৌরিত। তাঁর স্ত্রী অরুণিমাদেবী একইসঙ্গে গবেষণার কাজে যুক্ত।

- Advertisement -

ওই যুবকের কর্মকাণ্ড বিশ্বের বিভিন্ন গবেষক থেকে ইতিহাসপ্রেমীদের মধ্যে আলোড়ন ফেলে দিয়েছে। সৌরিত পিএইচডি করার সময় যে বিষয়গুলি নিয়ে গবেষণা করেছেন সেগুলি নিয়ে পরবর্তীতে একটি বই লেখেন তিনি। ইতিমধ্যেই ওই বইটি বিশ্বের একচল্লিশটি বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্কাইভে স্থান পেয়েছে। ব্রিটেন, নেদারল্যান্ডস, কানাডা সহ আরও বেশ কিছু দেশের গবেষক ও ইতিহাসপ্রেমীদের নিয়ে একটি আন্তর্জাতিকস্তরের টিম তৈরি করেছেন সৌরিত। এই টিম ইতিমধ্যেই বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মহামারি, দুর্ভিক্ষ,খাদ্যসংকট এবং তা থেকে বের হওয়ার উপায় নিয়ে গবেষণার কাজ শুরু করেছে। সৌরিত বলেন, আমাদের ভারতীয়দের অনেক কৃতিত্বই ইংল্যান্ডে ছোট করে দেখানো হয়। আমি সে জায়গাতেই আঘাত করেছি। ভারতীয় সাহিত্য, সংস্কৃতি, বিভিন্ন আন্দোলন থেকে মুক্তির উপায় যে ভারতীয়রাই বের করেছিল তা বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ুয়াদের পড়াচ্ছি। সেখানে আমার লেখা বইয়ে পাশাপাশি অন্য সিলেবাসের বইগুলিতেও ভারতীয় নানা দিক নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। সৌরিতের ছোটবেলার বন্ধু শহরের সমাজকর্মী রাতুল বিশ্বাস বলেন, সৌরিত আলিপুরদুয়ারের গর্ব। তার লেখা বই গোটা বিশ্বে আলোড়ন ফেলে দিয়েছে। এছাড়াও একটা প্রান্তিক জেলা থেকে উঠে গিয়ে যেভাবে ও ব্রিটিশদের ইংরেজি ভাষা সাহিত্য পড়াচ্ছে তাতে সত্যিই আমরা গর্বিত।