ক্যাম্পখাট দেখেই কী রাগ ন’কাকার

59

অরিন্দম স্যানাল : ন’কাকার সঙ্গে আমার প্রথম দেখা স্টেশনে। ওঁকে দার্জিলিংয়ের সেন্ট্রাল জেল থেকে কলকাতার প্রেসিডেন্সি জেলে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। আমি পৃথিবীতে এসেছি শুনে আমাকে দেখবেন বলে মায়ের কাছে জোরাজুরি। শেষটায় মা বাধ্য হয়ে আমাকে নিয়ে স্টেশনে হাজির হয়েছিলেন। এরপর থেকেই কাকা আমার জীবনে একটা মাইলস্টোন। জীবনে আজ যতটুকু বড় হয়েছি তার একটা বড় অংশেই যে ওঁর অবদান একথা বলার কোনও অপেক্ষা রাখে না।

কাকার রাজনীতি করাটা ঠাকুরদার একদম পছন্দ ছিল না। রাজনীতি ছাড়াবার কত চেষ্টা করেছেন, ব্যবসার বন্দোবস্ত করে দিতে চেয়েছেন। কিন্তু তা কোনও কাজেই দেয়নি। একদিকে ভালোই হয়েছে। ন’কাকা ব্যবসা করলে আর পাঁচটা সাধারণ মানুষের মতো হলে থোড়াই আমার হিরো হতেন।

- Advertisement -

সবাই বলে উনি আত্মহত্যা করেছেন। কিন্তু আমার মতে, ওটা স্বেচ্ছামৃত্যু। অসুস্থ হওয়ার পর প্রায়ই বলতেন, রাজনীতি করব কী, অন্যের কাছে তো ক্রমেই বোঝা হয়ে চলেছি। অসুস্থ কাকাকে শিলিগুড়িতে আমার কাছে এসে রেখেছি। কিন্তু উনি থাকতে চাইলে তো! নকশালবাড়ির ডেরায় ফেরার জন্য রীতিমতো ছটফট করতেন। কমিউনে মাটিতে খড় পেতে শুতেন। কিন্তু শরীর খারাপের পর তো আর মাটিতে শোওয়া যায় না। তাই একটা ক্যাম্পখাট কিনে নকশালবাড়িতে পাঠালাম। তারপর কাকাকে নিয়ে ওখানে পৌঁছালাম। কিন্তু সেই ক্যাম্পখাট দেখে কাকার কী রাগ! বললেন, হয় ঘরে উনি থাকবেন নয় ওই খাট। আমি কিছুটা আমতা আমতা করতেই ন’কাকা সেদিন কী বলেছিলেন তা আমার স্পষ্ট মনে আছে। জানিস, এই গ্রামের মানুষরা কীভাবে জীবন কাটায়? ওরা যদি মাটিতে শুয়ে থাকতে পারে তো আমি কোন ছাড়!

নকশালবাড়ির সেবদুল্লাজোত গ্রামে কাকার ডেরার পাশে একটুকরো জমিতে শৌচাগার। অসুস্থ মানুষটা যাতে শেষ কদিন একটু ভালোমতো থাকতে পারে তাই একটা ভালো শৌচাগার করে দেওয়ার কথা বলেছিলাম। কিন্তু সেই ক্যাম্পখাট প্রসঙ্গেরই অ্যাকশন-রিপ্লে। কাকার কথায়, শোন, এখানকার মানুষ ঘরে শৌচাগার পছন্দ করে না। এতে ঘরে দূষণ হয় বলে ওদের বিশ্বাস। ওদের বিশ্বাস আমারও। তাই আলাদা কোনও শৌচাগারের কোনও প্রশ্নই নেই। পারিস তো এটাকেই একটু ভালো করে দে।

কৃষকদের নিয়ে শিলিগুড়িতে আদালতে আসতেন। বাড়িতে খেয়ে যেতে বললে বলতেন, আমার সঙ্গে সাতজন আছেন। যদি সবার খাবারের ব্যবস্থা করতে পারিস, তবেই যাব নইলে নয়। পার্টির কাজে এই কাকাই বাইরে কোথাও গেলে আমার কাছে জেনারেল টিকিটের দাবি করতেন। কারও কাছে কিচ্ছুটি নিতেন না, প্রণামও নয়। নিজের মায়ের পর আমার মাকে স্থান দেওয়ায় অবশ্য ব্যতিক্রম। মায়ের তরফে ওঁর জন্য বছরে একজোড়া শার্ট, পাঞ্জাবি আর হাওয়াই চটি বরাদ্দ ছিল। জ্যোতি বসু ঘুরিয়ে মন্ত্রিত্ব দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। কাকা নাকচ করেছেন। অসুস্থ হওয়ার পর মেডিকেলে বিশেষ শুশ্রূষার ব্যবস্থা করা হলেও নিতে চাননি। সেই এক গোঁ, সবাই যা পায় সেটাই নেব। নইলে নয়।

এক সাংবাদিক কাকাকে নিয়ে ইংরেজিতে এক বই লিখলেন, বাহবা কুড়োলেন। পরে ফেরতের প্রতিশ্রুতিতে কাকার সমস্ত সার্টিফিকেট, জেলে বসা লেখা চিঠিপত্র নিয়ে গেলেন। সে সব ফেরত দেওয়া তো দূরে থাক, সেই বইয়ে একটি কপিও আমাদের দিলেন না। সার্টিফিকেটগুলি না ফেরত পাওয়ায় শেষমুহূর্র্তেও ন’কাকার আফসোস ছিল। শিলিগুড়ি ছেড়ে যাওয়া সেই সাংবাদিক আজকাল আমার ফোন তোলেন না।