বিশ্বজিৎ সরকার, রায়গঞ্জ : ফি বছর দশমী তিথিতে দেবীর বিসর্জনের পর যখন চারদিকে বিষাদের সুর ভেসে বেড়ায়, সেই সময় অন্য দুর্গাপুজোয় মেতে ওঠে রায়গঞ্জ ব্লকের কমলাবাড়ি-২ গ্রাম পঞ্চায়েতের খাদিমপুর এলাকা। গ্রামের ১৫০০ পরিবারের প্রায় ৭৫০০ হাজার মানুষের সম্মিলিত উদ্যোগে দশমীর রাত থেকে শুরু হয় ওই পুজো। এবার চলবে রবিবার পর্যন্ত। এলাকার প্রবীণ বাসিন্দা শচীন্দ্রনাথ বর্মন জানান, গ্রামের মঙ্গলকামনায় এলাকার বাসিন্দারা বংশপরম্পরায় বলাইচণ্ডীর পুজো করেন। প্রাচীন রীতিনীতি, আচার, নিষ্ঠা মেনে প্রতি বছর প্রচুর ভক্ত এই পুজোয় শামিল হন। পুজো কমিটির সম্পাদক শ্রীকান্ত বর্মন জানান, অন্যদের মতো আমরা দুর্গাপুজোর আনন্দে মাতি না। আমরা সারা বছর ধরে বলাইচণ্ডী পুজোর দিকেই তাকিয়ে থাকি। দশমীর রাত থেকে টানা পাঁচদিন গ্রামের বাসিন্দারা নতুন পোশাক পরে পুজোর আনন্দে মেতে ওঠে।

দুর্গারূপে পূজিতা হলেও দেবী বলাইচণ্ডী দশভুজা নন, তিনি চতুর্ভুজা। প্রতিমায় অসুর, মহিষের কোনো অস্তিত্ব নেই। সিংহবাহিনী বলাইচণ্ডীর পাশে লক্ষ্মী, গণেশ, কার্তিক ও সরস্বতীর মূর্তি আছে। মন্দিরের পুরোহিত তাপস চক্রবর্তী বলেন, প্রায় ৫০০ বছর আগে দশমী তিথিতে এই গ্রামে প্রাকৃতিক দুর্যোগে প্রচুর ফসল ও ঘরবাড়ির ক্ষতি হয়। বহু মানুষ মারা য়ায়। সেই থেকেই সমাজের মঙ্গলকামনায় বাসিন্দারা বলাইচণ্ডী পুজো শুরু করে। রীতি অনুয়াযী গ্রামবাসীরা যাতে পূজার্চনা করতে পারে, তার জন্য প্রতিমা বিসর্জন না দিয়ে বট-পাকুড় গাছে ঘেরা প্রাচীন মন্দিরে রেখে দেওয়া হয়। প্রতিবছর বিশ্বকর্মাপুজোর পরদিন দেবীর পুরোনো প্রতিমা বিসর্জন দেওয়া হয়। বিসর্জনের পর মৃৎশিল্পীদের প্রতিমার বরাত দেওয়া হয়। বংশপরম্পরায় শিল্পীরা এই প্রতিমা গড়েন। পুরোহিতরাও বংশপরম্পরায় পুজো করে আসছেন। পুজোর ৫ দিন পুরোহিত মঙ্গলয়জ্ঞ করেন। এদিন দূরদূরান্ত থেকে আসা ভক্তদের উৎসর্গ করা পাঁঠা, পায়রা মিলিয়ে ১৩৫টি বলি হয়েছে। বুধবার সকাল থেকে কয়েকশো ভক্ত অঞ্জলি দিয়েছেন। প্রসাদ হিসাবে খিচুড়ি, মিষ্টি ও ফল বিলি করা হয়েছে। পুজো উপলক্ষ্যে এক সপ্তাহ ধরে মেলা ও যাত্রার আসর বসে।

- Advertisement -

পুজো কমিটির সভাপতি ফুলকান্ত বর্মন বলেন, বংশপরম্পরায় পুজো করে আসা পুরোহিত তাপস চক্রবর্তীই এবার পুজো করছেন। পুজো কমিটির সদস্য শম্ভু বর্মন বলেন, মোট পাঁচদিন ধরে হবে এই পুজো। আজ থেকে শুরু হয়েছে পুজো। কাল থেকে মেলা রবিবার পর্যন্ত চলবে। মন্দির চত্বরে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের পাশাপাশি চণ্ডীগানেরও আযোজন করেছেন পুজো উদ্যোক্তারা। পাঁচদিন ধরে এই আসর চলবে। তিনি আরও বলেন, বলি প্রথা আমাদের এখনও চালু রয়েছে। প্রথমদিন পাঁঠা, পায়রা বলি দেওয়া হয়। এই পুজোয় কোনো চাঁদা তোলা হয় না। গ্রামবাসীরাই পুজো চালানোর দাযিত্ব বহন করেন। পুজো দেখতে শুধু রায়গঞ্জ শহর নয়, দূরদূরান্ত থেকে প্রচুর মানুষের সমাগম হয়।