চেনা-অচেনা সুরে মান্না দে

471

প্রসেনজিৎ দাশগুপ্ত: আজ পয়লা মে। মে ডে।৷ এক সময় প্রবাদ বাক্যের মত প্রচলিত ছিল – ‘মে ডে, মান্না ডে’ কথাটি। কারণ আজ তাঁরও জন্মদিন। এদিন ১০১ বছরে পা দিলেন কিংবদন্তি শিল্পী মান্না দে।

এই একশো এক বছরে না জানি কত অবিস্মরণীয় গানের ডালি উপহার দিয়েছেন তিনি। সেই গানের সুরে কেঁদেছে, হেসেছে, আনন্দে মাতোয়ারা, মথিত হয়েছে আসমুদ্রহিমাচল ভারতবর্ষ।

- Advertisement -

তবু একশো এক বসন্ত পার করে এসে মনে হয় কতটা চিনেছি আমরা মান্না দে’কে? যথাযত সম্মান দিতে পেরেছি কি আমরা তাঁর গায়ণ প্রতিভাকে? বাস্তব’টা অন্য রকম। তাঁর গাওয়া কত শত গান আজও লোকচক্ষুর আড়ালে একা একা দীর্ঘশ্বাস ফেলে…সমাদর পেতে চায়, অথচ আমরা তা দেখেও দেখিনা।

১৯৭৩ সালে নির্মিত হয়েছিল হিন্দী ছায়াছবি ‘আরোপ’। গুরু দত্তের দাদা আত্মারাম নির্দেশিত, বিনোদ খান্না, বিনোদ মেহরা, ভরত ভূষণ ও সায়রা বানু অভিনীত সাতের দশকের বহুলচর্চিত এই রোম্যান্টিক-থ্রিলারের কথা আজ আমরা অনেকেই ভুলে গেছি। প্রত্যাশার তুলনায় তেমন চমক দেখাতে না পারলেও, সে যুগে যথেষ্ট সমাদর পেয়েছিল ‘আরোপে’র গান’গুলি।

‘আরোপে’র সুরকার ছিলেন ভুপেন হাজারিকা। সেই ভুপেন হাজারিকা যাকে আমরা চিনেছি ‘গঙ্গা বইছো কেন’, ‘মানুষ মানুষের জন্য’, ‘আমি এক যাযাবরে’র মত অহমিয়া ও বাংলা ভাষায় অজস্র কালজয়ী গান বা কল্পনা লাজমির ‘রুদালী’র অমর সুরকার’রূপে। কিন্তু কেরিয়ারের প্রথমদিকে কেমন সুররচনা করেছিলেন ভুপেন হাজারিকা তার কতটাই বা জানি?

বলে রাখা ভাল, ১৯৭৩ সালে ‘আরোপে’র হাত ধরেই প্রথম বলিউডে মিউজিক ডিরেক্টর’রূপে আত্মপ্রকাশ করেন হাজারিকা। আত্মারামের হাত ধরেই বলিউডে পেয়েছিলেন প্রথম ‘ব্রেক’ পান। মায়া গোবিন্দের রচনায় ‘আরোপে’র জন্য আট’টি গানে সুর দিয়েছিলেন তিনি। এর ঠিক দুবছর পর ১৯৭৫ সালে নীরদ চৌধুরীর লেখা ছোটগল্প অবলম্বনে ‘চামেলি মেমসাহেব’-র সুররচনার জন্য জাতীয় পুরস্কার ছিনিয়ে নেন হাজারিকা। অথচ তার ‘প্রথম পদক্ষেপে’ই বাজিমাৎ করেছিলেন ভুপেনবাবু। ‘আরোপ’ ছায়াছবিতে কিশোর-লতার কন্ঠে ‘নয়নো মে দর্পণ হ্যায়’ গানটি আজও মানুষ মনে রেখেছি। কিন্তু ভুলে গেছে মান্না দে’র কন্ঠে ‘আরোপে’রই তিন’টি সুমধুর অথচ ব্যতিক্রমী গানের কথা।

আট’টি গানের মধ্যে তিনটি গান গেয়েছিলেন মান্না দে। রোম্যান্টিক বা ভজন নিয়ে একটি দুটি গান থাকলেও, সম্পূর্ণ ভিন্নধারার এই তিনটি গানের জন্য ভুপেন বাবুর প্রথম পছন্দ ছিলেন মান্না দে। সেই মতন তাকে দিয়ে গান তিনটি গাইয়েও নিয়ে ছিলেন ভুপেন হাজারিকা। এর মধ্যে ‘ওহ ফুলো কে দেশ’ ও ‘হাত মেরে জ্যায় মধু’ মত কম্পোজিশন ছিল সম্পূর্ণ রাগাশ্রয়ী। রাগ মিঁয়া কী মলহার, বসন্ত মুখারী ও পটদীপে নিবদ্ধ গান’দুটি অসামান্য দক্ষতার সঙ্গে গেয়েছিলেন মান্না দে। রাগাশ্রয়ী গানে সেদিনও মান্না ছিলেন অপ্রতিদ্বন্দ্বী। তিনি যে কোন মার্গের গায়ক তা এই দুটি গানে সহজেই বোঝা যায়।

তৃতীয় গানটি ছিল চমকের চূড়ান্ত। অন্য কিছু নয়, সরাসরি রবীন্দ্রসংগীতকে বলিউডের আঙিনায় নিয়ে আসেন ভুপেনবাবু। মায়া গোবিন্দের হিন্দী তর্জমায় ‘দিনগুলি মোর সোনার খাঁচায় রইল না’ পরিবর্তিত হয়ে দাঁড়ালো ‘টুট গ্যয়া মোরা সপনা সুহানা’-তে। মন, প্রাণ উজার করে গাইলেন মান্না দে। ইমন-পূর্বী রাগে নিবদ্ধ কম্পোজিশন-টি সেই সময় আলোড়ন ফেললেও পরবর্তী কালে লোকে তা ভুলেছে। খুব সম্ভবতঃ আত্মারাম’জির নির্দেশনায় ‘আরোপ’-র হাত ধরে বলিউডে মেইনস্ট্রিম সিনেমায় খুব সম্ভবত প্রথম ব্যবহৃত হয় রবীন্দ্রনাথের সুর। সৌজন্যে – ভুপেন হাজারিকা ও মান্না দে।

দুর্ভাগ্য, ভুপেন হাজারিকার সুরে ও মান্না দের কন্ঠে হিন্দীতে এই অসামান্য তিনটি কম্পোজিশন ও বিশেষ করে বলিউডি ‘রোম-থ্রিলে’ রবি ঠাকুরের সুর…ইতিহাস ভুলে গেছে। ‘আরোপে’র সূত্রে তাই আবার নতুন করে চেনার চেষ্টা এই দুই বিরল প্রতিভাকে, যাদের অবদান ভারতীয় সিনে সঙ্গীত’কে এক অন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিল। ‘আরোপ’ ছিল তাদের প্রথম মাইলফলক। আজ সেই গান তিনটির কথা, কিংবদন্তি শিল্পী মান্না দে’র ১০১ জন্মতিথি উপলক্ষে, স্মৃতি সরনী থেকে তুলে এনে ইতিহাসের রুক্ষ পাতা থেকে ধুলো ঝাড়ার সামান্য প্রচেষ্টা না হয় ধরা রইলো এভাবেই।
১০১ বছর পার করে আজও সমান ব্যাতিক্রমী তিনি। আজও সমান উজ্জ্বল, রহস্যাবৃত। আর কেউ নন, তিনি মান্না দে।