রাগ কেদার ও সত্যজিৎ

441

প্রসেনজিৎ দাশগুপ্ত: সাল ১৯৯২।  সত্যজিৎ রায়ের ‘শাখা-প্রশাখা’।
শেষ দৃশ্য।
সুস্থ হয়ে উঠছেন আনন্দ মজুমদার। কার্ডিয়াক আরেস্টের আঘাতকে পিছনে ফেলে। কিন্তু তার চেয়েও বড় আঘাত খানিকক্ষণ আগেই পেয়েছেন তিনি।
ছোট্ট নাতি ডিঙ্গো দাদুর সঙ্গে দেখা করতে এসে অকপট সারল্য ও সততায় জানিয়ে গেছে তার বাবা ও কাকার ‘এক নম্বরি’, ‘দু নম্বরি’ রোজগারের কথা। প্রশ্ন করেছে তার দাদুকে, সে কত নম্বরি? তিন নম্বরি? চার নম্বরি?

সৎ, আদর্শবান আনন্দের কাছে তার দুর্নীতিগ্রস্ত সন্তানদের ‘আসল পরিচয়’ এভাবে উঠে আসায় তিনি বিপর্যস্ত, বিধবস্ত, বজ্রাহত। যেন সব স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হয়েছে তাঁর। এর চেয়ে যেন মৃত্যুও শ্রেয় তার কাছে।

- Advertisement -

বাবার সঙ্গে দেখা করে একে একে ফিরে যাচ্ছে ছেলেরা, প্রবোধ-প্রবীর-প্রতাপ। তারা নিজেদের জগতে ব্যস্ত মানুষ। মিলিয়ে যাচ্ছে গাড়ির কর্কশ আওয়াজ।
ধীরে ধীরে বাবার ঘরের সামনে এসে দাঁড়ায় প্রশান্ত। তার কোথাও যাওয়ার নেই। সে মানসিক ভারসাম্যহীন। অথচ তার আদর্শ, বিবেক, সততা চির অটুট। ছেলেকে দেখতে পেয়ে ঝকঝক করে ওঠে আনন্দ মজুমদারের চোখ। তাকে কাছে ডাকেন। বলে ওঠেন-‘তুইই আমার সব রে প্রশান্ত, তুই আমার সব!’
বাড়িয়ে দেন হাত। সন্তানের দিকে। পিতার হাত ধরে পুত্র। সেই হাত বুকে টেনে নেন পিতা। অস্ফুট কন্ঠে বলে ওঠেন ‘শান্তি শান্তি শান্তি!’

……..
সত্যজিতের ‘শাখা-প্রশাখা’ সেই অর্থে কোনদিনই আমার পছন্দের তালিকায় ঠাঁই পায়নি। কিন্তু তাও যতবার দেখতে বসেছি, এই শেষ দৃশ্যটি আমায় নাড়িয়ে দিয়ে যায়। শুধু গল্প বলার ধরণ বা অভিনয় নয়, তার নেপথ্য সঙ্গীতের জন্য বারবার এই ছবিটির কাছে ঘুরে ফিরে আসা।

সিনেমাটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র প্রশান্ত (সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়) মানসিক ভারসাম্যহীন হলেও সে ওয়েস্টার্ন ক্লাসিকের অনুরক্ত। রাতে তার ঘর থেকে ‘গ্রেগরিয়ান চ্যান্টস’, বাখ বা বেঠোফেন ভেসে আসে। অসামান্য মুনশিয়ানায় প্রাশ্চাত্য সংগীতের ব্যবহার করেছেন সত্যজিৎ তার এই ছবিটিতে। ছিল শ্রমণা গুহঠাকুরতার কন্ঠে একটি রবীন্দ্রসংগীতও। সম্পূর্ণ নয়, খণ্ডাংশ। ‘মরি লো মরি, আমায় বাঁশীতে ডেকেছে কে’। কিন্তু সে সব ছাপিয়ে শেষ দৃশ্যে পণ্ডিত অজয় চক্রবর্তীর কন্ঠে কেদারের আলাপ…অতুলনীয়, অপার্থিব, অদ্ভুত অনন্যসাধারণ।

একে অন্যের হাত ধরে থাকা অসহায় পিতা-পুত্র, শান্তিধবনি ও ‘এন্ড ক্রেডিটস’-এ অজয়বাবুর কেদার রাগের সেই আলাপ আজও কোথাও মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয় নিজ স্বত্তার সম্মুখে। অতনু চক্রবর্তী তার ‘সিনেমা সঙ্গীত ও সত্যজিৎ’ বইতে রাগটির ব্যবহার, চলন এবং গায়ণ নিয়ে সত্যজিৎ-অজয়বাবুর অসামান্য কেমিস্ট্রির কথা তুলে ধরেছিলেন। পরবর্তী কালে টলিউড-বলিউড বিভিন্ন সিনেমায় অজয়বাবু কন্ঠ মাধূর্য রাখলেও, ‘শাখা-প্রশাখা’য় তার সেই ছোট্ট আলাপ পর্যায়টি আজও অবিস্মরণীয়।

কাল সারারাত ঘুরিয়ে ফিরিয়ে সেই দেড় মিনিটের আলাপ পর্বটি শুনতে শুনতে মনে হচ্ছিল, কেদারই বোধহয় এমন নিভৃত অখণ্ড আশ্রয়, মনের ভিতর আরেকটি মনের মায়া-সরনীর সন্ধান দিতে পারে। মনে মনে কোথাও আমিও যেন অন্ধকারে নিজের হাত বাড়িয়ে দিয়েছি আমার সন্তানের দিকে, বুকের গভীরে তার ছোট্ট হাতদুটি টেনে খুঁজেছি শান্তির আশ্রয়। মানিকবাবু তা বুঝে ছিলেন, অজয়বাবুর মাধ্যমে দেখিয়ে ছিলেন তার হদিশ। সেই পথ চিনে কতটা হাঁটতে পেরেছি আমরা, তা সময়ই বলবে।

আজ সত্যজিতের ৯৯তম জন্মদিনে রাগ কেদারের সেই অশ্রুত মন্ত্রোচ্চারণের মাধ্যমেই তাঁর স্মৃতিতে শ্রদ্ধাঅর্পণ।
মহারাজা, তোমারে সেলাম…