চরম নীরবতার মাঝে নন্দীগ্রামে টক্কর সমানে-সমানে

112

এ বার বিধানসভা নির্বাচনে সবচেয়ে নজরে একটা বিশেষ কেন্দ্র। নন্দীগ্রাম। যেখানে নিজের কেন্দ্র বদলে দাঁড়িয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। প্রতিপক্ষ তাঁর একসময়ে সতীর্থ শুভেন্দু অধিকারী। কেমন উত্তাপ ছড়াচ্ছে ভোটের নন্দীগ্রাম? বিশেষ সিরিজ উত্তরবঙ্গ সংবাদের

দীপ্তিমান মুখোপাধ্যায় : চণ্ডীপুর বাজার থেকে কিছুদূর এগোলেই নন্দীগ্রাম বিধানসভা কেন্দ্রে পৌঁছে যাওয়া যায়। দেখলে মনে হবে কোনও গোবলয়ের রাজধানী। চারিদিকে শুধু গেরুয়া পতাকা। নন্দীগ্রামে এখানেই বিজেপি প্রার্থী শুভেন্দু অধিকারীর অফিস। শুভেন্দুর নানা ধরনের কাটআউটে ভরে গিয়েছে রেয়াপাড়া অঞ্চল। পালটা বাংলা নিজের মেয়েকেই চায় স্লোগানে চারিদিকে বড় বড় ব্যানার। সেখান থেকে আর কয়েক কিলোমিটার এগোলেই নন্দীগ্রাম বাজার। যাওয়ার পথে দু-ধারেই গেরুয়া পতাকার পাশাপাশি তেরঙা ঝান্ডার ছড়াছড়ি। তারপরই আসবে নন্দীগ্রাম বাসস্ট্যান্ড। কিছুটা এগোলেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ে দু-কামরার বাড়ি।  এই এলাকায় অজস্র তৃণমূলের পতাকা। কিন্তু তারই মাঝে জ্বলজ্বল করছে একাধিক ব্যানার। নন্দীগ্রাম মেদিনীপুরের ভূমিপুত্রকে চায়, বহিরাগতকে নয়। ব্যানারগুলি এমনভাবে লাগানো হয়েছে, তৃণমূলনেত্রী বাড়ি থেকে বেরোলেই তা চোখে পড়বে। এবারের ভোটের এপিসেন্টার নন্দীগ্রাম যেন সত্যিই রণভূমি। অদ্ভুত নীরবতা গ্রাস করেছে গোটা নন্দীগ্রামকে। নেই রাজনৈতিক আলোচনা, নেই তর্ক-বিতর্ক। এটা কি ঝড়ের পূর্বাভাস?

- Advertisement -

চরম নীরবতার মাঝে নন্দীগ্রামে টক্কর সমানে-সমানে| Uttarbanga Sambad | Latest Bengali News | বাংলা সংবাদ, বাংলা খবর | Live Breaking News North Bengal | COVID-19 Latest Report From Northbengal West Bengal Indiaনন্দীগ্রাম আছে নন্দীগ্রামেই। নন্দীগ্রাম বাজারে ১৪ বছর আগেও আন্দোলনের পূর্বাভাস পাওয়া যায়নি। ৭ জানুয়ারি নন্দীগ্রাম হলদিয়া ডেভেলপমেন্ট অথরিটির জমি অধিগ্রহণের নোটিশের বিরুদ্ধে যে গর্জে উঠবে, তা ঘুণাক্ষরেও টের পাওয়া যায়নি। রাতারাতি বদলে দিয়েছিল চিত্র। নন্দীগ্রাম থেকে ভাঙাবেড়া হয়ে তেখালি ব্রিজ যাওয়ার রাস্তা পর্যন্ত গর্জে উঠেছিল হিন্দু-মুসলিম। আগামী ১ এপ্রিল নন্দীগ্রাম শুভেন্দুকে চায় নাকি দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে তাঁদের পছন্দের তার হদিস এখনও অস্পষ্ট।

নন্দীগ্রাম বাসস্ট্যান্ডেই একটি চায়ের দোকানে পতপত করে উড়ছিল তৃণমূলের পতাকা। ওই চায়ের দোকানের মালিক সুশান্ত গিরি বলেন, নন্দীগ্রামকে বোঝা এত সহজ। রাজ্যের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের প্রধান কান্ডারি নন্দীগ্রাম। মানুষ কী চায় ২ মে বোঝা যাবে। সেখান থেকে আরেকটু এগোলেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ে ভাড়া নেওয়া দুটি ঘরের একটি বাড়ি। তার সামনেই চা বিক্রি করছিলেন রমাকান্ত মাইতি। তিনি বলছিলেন, যেদিন নন্দীগ্রামে জমি অধিগ্রহণের কথা শুনেছিলাম, আমরা প্রতিবাদ করেছিলাম। যেদিন প্রতিবাদ করার নিশ্চয়ই করব। এবার কি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জিতবেন? তাঁর সপাট উত্তর, দাদা না দিদি তা বুঝতে একটু সময় লাগবে।

অদ্ভুত নীরবতা গ্রাস করেছে গোটা নন্দীগ্রামকে। নেই কোনও উচ্ছ্বাস। নেই কোনও উন্মাদনা। বুধবারই মনোনয়নপত্র দাখিল করেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। শুক্রবার মনোনয়নপত্র জমা দিতে হলদিয়া মহকুমা শাসকের অফিসে হাজির হবেন শুভেন্দু অধিকারী। কিন্তু রাজনৈতিক উত্তাপ যখন তুঙ্গে, তখন বড্ড নিষ্প্রভ নন্দীগ্রাম। নন্দীগ্রাম কী রায় দেয়, তা সময়ই বলবে। তবে নন্দীগ্রামের শহিদদের কাছে আনতে কেউই চেষ্টার কসুর করছেন না। নন্দীগ্রাম মনে করছে, রাজনৈতিক সমাপতন হবে এই নন্দীগ্রাম থেকেই। তা দাদাও হতে পারে, দিদিও হতে পারে।

২০০৭ সালের ১৪ মার্চ উত্তপ্ত হয়ে উঠেছিল তেখালি ব্রিজ। ওই ব্রিজ আজ বড্ড শান্ত। যে ব্রিজের দু-ধারে পুলিশ এবং আন্দোলনকারীদের লড়াই চলেছিল, যেখানে ১৪ জনের মৃত্যু হয়েছিল, আজ সেই ব্রিজে কোনও রাজনৈতিক দলের পতাকাও নেই। নন্দীগ্রামে এক ইঞ্চি জমিও যে কেউই ছাড়তে রাজি নয়, তা স্পষ্ট। রেয়াপাড়ায় শুভেন্দু অধিকারীর অফিসে এদিন সকাল থেকেই ছিল তুমুল ব্যস্ততা। শুভেন্দু ঝাড়গ্রামে রাজনৈতিক কর্মসূচিতে গেলেও তাঁর ব্যানার-পোস্টার বিলি ও অন্যান্য কাজে ব্যস্ত কর্মীরা। কথা বলার ফুরসত নেই তাদের। সন্ধ্যায় দাদা এসে খোঁজ নেবেন, তাই কাজে ফাঁকি দিতে চাইছেন না কেউই।

একই ব্যস্ততা তৃণমূলের অফিসেও। তৃণমূলের মন্ত্রী পূর্ণেন্দু বসু, রাজ্যসভার সদস্য সুখেন্দুশেখর রায় ঘাঁটি গেড়ে বসে রয়েছেন নন্দীগ্রামে। বুধবার মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মনোনয়ন জমা দিয়েছেন। তাঁর কাগজপত্র তৈরিতে ব্যস্ত ছিলেন সুখেন্দুশেখরবাবু। দলের সাংগঠনিক হালহকিকত খতিয়ে দেখছিলেন পূর্ণেন্দু। তাঁদের সহযোগিতায় ছিলেন নন্দীগ্রামের তৃণমূল নেতা শেখ সুফিয়ান। দেখা গেল না জমি আন্দোলনের আরেক নেতা আবু তাহেরকে। তৃণমূল নেতাদের বুথ ধরে ধরে রাজনৈতিক পর্যালোচনায় ব্যস্ত। দলের আইটি সেল তৃণমূলনেত্রীর প্রচারসামগ্রী দুটি ব্লকে পৌঁছে দিতে ব্যস্ত হয়ে  পড়েছেন।  বোঝাই যাচ্ছে, রাজ্য রাজনীতির ব্যাটলগ্রাউন্ড নন্দীগ্রাম, এবারের ভোটের এপিসেন্টার নন্দীগ্রাম।