সাহা বংশের শতবর্ষের মিষ্টি তিলের মোদকে মেতেছে হরিশ্চন্দ্রপুর 

284

সৌরভকুমার মিশ্র, হরিশ্চন্দ্রপুর : মকর সংক্রান্তিতে মিষ্টি তিলের মোদকের স্বাদে মাতোয়ারা হরিশ্চন্দ্রপুরবাসী। পৌষ সংক্রান্তির পিঠেপুলির মধ্যেও প্রাচীন এই মিষ্টির জন্য উদগ্রীব হয়ে থাকেন হরিশ্চন্দ্রপুর থানা এলাকার বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষ। মূলত হরিশ্চন্দ্রপুরের রারিয়াল গ্রামের সাহা পরিবার এই মিষ্টির মূল কারিগর। এই বংশের পূর্বপুরুষের হাত ধরে এই মিষ্টি তৈরির গুপ্ত রেসিপি এখনও বংশের উত্তরসূরিদের হাতেই রয়েছে। এখনও হরিশ্চন্দ্রপুর এলাকার অন্যান্য জায়গায় এই মিষ্টি পাওয়া যায় না। বংশপরম্পরায় এই বংশের সদস্যরাই বিশেষ সময়ে এই তিলের মোদক তৈরি করেন। এই মিষ্টি তৈরির প্রধান উপকরণ তিল। পৌষ মাসের নতুন তিল ওঠার সঙ্গে সঙ্গে এই মিষ্টি তৈরির প্রস্তুতিও শুরু হয়ে যায়। নতুন তিল ধুয়ে খোসা ছাড়িয়ে তারপর রোদে শুকোনো হয়। সেটাকে জাতায় বেটে গুঁড়ো করা হয়। তারসঙ্গে পরিমাণ মতো ক্ষীর, চিনি মেশানো হয়। তারপর কাঠের আগুনে মৃদু আঁচে বিশেষ পদ্ধতিতে পাক দিয়ে তৈরি হয় এই মিষ্টি। মকর সংক্রান্তির দিন থেকেই এই মিষ্টি পাওয়া যায়। তারপর আস্তে আস্তে শীত চলে গেলে মিষ্টি তৈরিও বন্ধ হয়ে যায়।

সাহা বংশের শিবেশচন্দ্র সাহা বলেন, এই মিষ্টির আবিষ্কর্তা আমাদের পূর্বপুরুষ। তবে কে এই মিষ্টি তৈরি করেছিলেন তার সঠিক তথ্য আমাদের কাছে নেই। তবে যেটুকু জানি, নতুন তিল ওঠার সময় স্থানীয় জমিদার গৃহিণীর আবদারে তিলের নতুন ধরনের মিষ্টি বানানোর বরাত পান আমাদের পূর্বপুরুষরা। সেই সময় তিলের গুঁড়ো, ক্ষীর প্রভৃতি নিয়ে পরীক্ষানিরীক্ষা করতে করতে তিলের মোদকের আবিষ্কার করে বসেন তাঁরা। এই মিষ্টি খেয়ে ইংরেজ সাহেব মেমরাও প্রশংসা করেন। জমিদারও খুশি হয়ে আমাদের বংশের পূর্বপুরুষদের ব্যবসা করার জন্য নিষ্কর জমি দান করেন। তিনি বলেন, মকর সংক্রান্তির দিন থেকে আমি সাইকেলে করে তিলের মোদকের কৌটো নিয়ে হরিশ্চন্দ্রপুর এলাকার বিভিন্ন গ্রামে ফেরি করি। প্রতিদিন প্রায় ৪০ থেকে ৫০ কিলোমিটার সাইকেল চালাই। প্রতিদিনই ২০ থেকে ২৫ কিলো মোদক বিক্রি হয়। এ বছর কেজি প্রতি দাম ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকা রাখতে হয়েছে। কারণ কাঁচামালের দাম বেড়েছে। তিলের মোদক পাঠানোর জন্য বিদেশ থেকেও অনুরোধ আসে। শিবেশবাবু চান, এই মিষ্টিও রসগোল্লার মতো জিআই ইনডেক্স লাভ করুক। আগামীতে তিলের মোদকের পেটেন্টের জন্যও তিনি চেষ্টা করবেন বলে জানান।

- Advertisement -

শীতের সকালে দিলে মোদক কিনতে আসা থানাপাড়ার বাসিন্দা সন্তোষ রজক বলেন, বছরের এই সময়টাতেই এই মিষ্টিটা এখানে পাওয়া যায়। হরিশ্চন্দ্রপুরের মধ্যপাড়ার বাসিন্দা দীপক দাস বলেন মকর সংক্রান্তির পুজোয় তিলের মোদক অপরিহার্য। বাংলা-বিহার সীমান্তবর্তী হরিশ্চন্দ্রপুর ঘেঁষা আজিমনগর থানার দামাইপুর এলাকায় মরা মহানন্দায় প্রতিবার মকর সংক্রান্তি উপলক্ষ্যে পুণ্যস্নানে যোগ দেন হরিশ্চন্দ্রপুর সহ জেলার বিভিন্ন অঞ্চলের কোচ ও রাজবংশী সম্প্রদায়ের মানুষ। এইসময় দামাইপুরে বহু যুগ ধরে মকর সংক্রান্তি উপলক্ষ্যে মেলা বসে। প্রায় পনেরো দিন ধরে পুণ্যস্নান উপলক্ষ্যে মেলা চলে। ভোর রাতে মকর সংক্রান্তির মহাস্নানে যোগ দিতে হরিশ্চন্দ্রপুর থানা এলাকার হলদিবাড়ি, রাধানগর, বরই, কুশিদা, তুলসীহাটা, বৈরাট সহ জেলার বিভিন্ন রাজবংশী অধ্যুষিত এলাকা থেকে দলে দলে মানুষ এই মেলায় যোগ দিতে আসেন। হলদিবাড়ি এলাকার ধর্ম দাস বলেন, এই মেলা চলে ১৫ দিন ধরে। বিহার থেকেও প্রচুর মানুষ মেলায় আসেন। অন্যদিকে, হরিশ্চন্দ্রপুর থানা এলাকার বড়ই গ্রাম পঞ্চায়েতের গোহিলাতেও এ দিন ভোররাত থেকে মহাস্নান শুরু হয়ে গিয়েছে। মেলার আয়োজক কমিটির সদস্য জয়ন্ত মজুমদার বলেন, বাংলা ছাড়াও বিহার ও  ঝাড়খণ্ড থেকে প্রচুর ভক্ত আসেন। তবে এবার করোনা পরিস্থিতির জন্য বিশেষ সাবধানতা রেখেছি। মাস্ক পরে মন্দিরে প্রবেশ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। মন্দিরের মেলা চত্বর ঘনঘন স্যানিটাইজ করা হচ্ছে।