নীরবে পরিবারকে আগলে রাখেন ববিতা

97

মোস্তাক মোরশেদ হোসেন, বীরপাড়া : কর্তব্য, দায়বদ্ধতা ও মমতা নিয়ে আক্ষরিক অর্থেই বরাবর নীরব মেয়েটা। কারণ, জন্ম থেকেই মূক তিনি। তবে তাঁর জীবনের প্রতিটি দিন যেন ওই শব্দগুলির একেকটা উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। নিজে মূক হয়ে গোটা পরিবারের কর্ত্রী ববিতা দোরজি। বাবা-মা কেউই নেই। উলটে, বৃদ্ধা ঠাকুমার ভাত জোটানোর দায়িত্বও রয়েছে তাঁর ওপরই। বাড়িতে রয়েছে আরও দুই বোন। জন্মাবধি মূক ওরাও। তবে হাল ছাড়েননি বীরপাড়া সংলগ্ন ডিমডিমা চা বাগানের ওই যুবতী। বোন, ঠাকুমার পেটে অন্ন জোটানোর পাশাপাশি নিজে স্কুলে পড়াশোনা করে মাধ্যমিক পাশ করেছেন। বোনেদেরও পড়াচ্ছেন।  পড়শিরা বলছেন, ধন্যি মেয়ে।

ববিতারা পাঁচ বোন। ববিতাই বড়। পাঁচজনের মধ্যে দুজন কথা বলতে পারলেও জন্ম থেকেই মূক বাকি তিনজন। ডিমডিমার তারাঞ্জু লাইনের বাসিন্দা সারকি দোরজির ঘরে অভাব ছিল বরাবরই। অভাবের তাড়নায় বছর আটেক আগে কাজের খোঁজে দিল্লি গিয়েছিলেন সারকির স্ত্রী, ববিতাদের মা পূর্ণিমা দোরজি। আজও ফেরেননি তিনি। এদিকে, ২০১৬ সালে খুন হন সারকি দোরজি। ঘরে অভিভাবক বলতে তখন সারকির মা ষাটোর্ধ্ব পিকটি দোরজি। তাই সংসারের জোয়াল কাঁধে তুলে নিতে হয় সারকির বড় মেয়ে ববিতাকেই। বাগান তখন বন্ধ ছিল। ববিতা ছোটেন ইটভাটায়। খুঁজে নেন শ্রমিকের কাজ। পেটের দায়ে কখনও ছোটেন নদীতে পাথর ভাঙতে। পাশাপাশি চলতে থাকে পাঁচ বোনের পড়াশোনা। পরে ২০১৯ সালে খোলে ডিমডিমা চা বাগান। পারিবারিক অধিকার সূত্রে চা বাগানের শ্রমিক হিসেবে কাজ পান তিনি। ততদিনে মাধ্যমিক পাশ করেছেন। এখন ফের স্কুলে ভর্তি হয়েছেন তিনি। পড়তে চান। বছর বাইশের ববিতা এখন বিশেষভাবে সক্ষমদের একটি স্কুলের একাদশ শ্রেণির ছাত্রী। তাঁর বোন অনিতা দোরজি মহাবীর হিন্দি হাইস্কুলে দশম শ্রেণির ও সুনীতা দোরজি মারিয়া গোরেথি হিন্দি হাইস্কুলের ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্রী।

- Advertisement -

তবে, হতদরিদ্র ওই পরিবারের বরাতে আজ পর্যন্ত সরকারি ঘরও জোটেনি। ভাঙাচোরা একটা ঘরেই দিন কাটে চারজনের। ছোট্ট ঘরে রয়েছে একটাই চৌকি। তাতে তিন বোন শোয়। ঠাকুমার রাত কাটে মাটির মেঝেতে মাদুর পেতে। শিশুঝুমরা গ্রাম পঞ্চায়েতের স্থানীয় সদস্য জয়প্রকাশ টোপ্পো অবশ্য বলেন, ওই পরিবারটির জন্য সরকারের তরফে ঘর বরাদ্দ করা হয়েছে। খুব শীঘ্রই ঘর তৈরির কাজ শুরু হবে।

পাঁচ বোনের মধ্যে সবিতা দোরজি ও কবিতা দোরজির বাকশক্তি রয়েছে। ঘর বাঁধতে দিদির ঘর ছেড়েছেন সবিতা ও কবিতা। সবিতা ইতিমধ্যে মাও হয়েছেন। দুই নাতনি জীবনসাথী বেছে নেওয়ায় বৃদ্ধা পিকটি দোরজি খুশি। তবে, বাকি তিন নাতনির কথা ভেবেই  তাঁর  মন খারাপ হয়ে যায়। তিনি বলেন, ওদেরও তো বিয়ে দিতে হবে। বিশেষ করে ববিতার তো বিয়ের বয়সও হয়েছে। কিন্তু ওরা তো কথা বলতে পারে না। ওদের জন্য পাত্র কোথায় পাব? আমরা খুব গরিব। কিন্তু এখনও পর্যন্ত সরকারের তরফে ঘর পর্যন্ত পাইনি।