সপ্তর্ষি সরকার, ধূপগুড়ি : কখনও পথচলতি মানুষের গাঁ ঘেষে বিদু্য়তের গতিতে চলে যাচ্ছে তো কখনও রাতের শহরে দাপিয়ে চলছে গতির খেলা। শুধু তাই নয়, গতি আর স্টান্টের প্রতিটি মুহূর্ত রেকর্ড করা হচ্ছে চালকের হেলমেটে লাগিয়ে রাখা ক্যামেরায়। আর এইসব দামি বিদেশি মোটরবাইক আর তার বেপরোয়া চালকদের দাপটে ধূপগুড়িতে নাভিশ্বাস উঠছে পথচলতি মানুষের। বিশেষত মহিলা, শিশু ও বয়স্কদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। বিষয়টি নিয়ে দ্রুত পদক্ষেপ করুক প্রশাসন, চাইছেন নাগরিকরা।

গত কয়েক বছরে ধূপগুড়ি শহরে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে এমন বাইকের সংখ্যা। বাজারে নামি ব্র‌্যান্ডের মোটরবাইকের চাহিদা যেমন রয়েছে, তেমনি কমবয়সিদের মধ্যে প্রতিনিয়ত বাড়ছে স্পোর্টস বাইকের নেশা। এইসব বাইকের চালকরা আবার নিজেদের মধ্যে গড়ে তুলেছেন বাইকার্স ক্লাব। এই ক্লাবের সদস্য হতে গেলে শুধু বাইক থাকলেই হয় না, সঙ্গে চাই মডেল অনুযায়ী মানানসই অ্যাকসেসরিজ, আউটফিট এবং অ্যাপ্রোচ। অর্থাত্, শুধু দুই-আড়াই লক্ষ টাকা দামের বাইক হলেই হবে না, তার সঙ্গে থাকতে হবে দামি পোশাক এবং হেলমেট সহ অন্য সামগ্রী। মাত্র কয়েক সেকেন্ডে গতির শীর্ষে ওঠার ক্ষমতাসম্পন্ন এইসব বাইক নিয়ে গড়ে ওঠা বাইকার্স

ক্লাবের সদস্যরা আবার প্রায়ই টুরে বের হন। যার ছবি ও স্টান্ট ভিডিয়ো দেখা যায় ফেসবুক বা অন্য সোশ্যাল মিডিয়ার দেয়ালে।

দামি বাইকে সওয়ার হয়ে গতির নেশায় মেতে ওঠা এই কমবয়সি চালকরা অনেক সময়ই নিজেরা ঠেমন ছোটো-বড়ো দুর্ঘটনার কবলে পড়ছে, তেমনি তাদের তীব্র গতির সামনে পড়ে আতঙ্কে দুর্ঘটনাগ্রস্ত হচ্ছেন পথচলতি অনেকেই। সম্প্রতি এই কমবয়সি বাইকচালকদের দাপট ও গতির দৌরাত্ম্যের হাত থেকে বাঁচতে শহরের বেশ কিছু এলাকার নাগরিকরা পুলিশ ও ট্রাফিক বিভাগের দ্বারস্থ হয়েছেন। বাইক বাহিনীর দাপটে অতিষ্ঠ পেশায় ব্যাংককর্মী বাসুদেব বসাক বলেন, একেবারেই কমবয়সি এই ছেলেদের হাতে দ্রুত গতির বাইকগুলো য়েন মারণাস্ত্র হয়ে উঠেছে। অনেক বয়স্ক নাগরিক বা বাচ্চা

ওই বাইকের আওয়াজে ভয় পেয়ে পড়ে গিয়ে আহত হয়েছে। আমরা বাইক চালানোর বিরুদ্ধে নই। তবে সেই কারণে কেউ নিজেদের বা অন্য কারও ক্ষতি করুক, সেটা চাই না। এই কারণে আমরা ট্রফিক ও পুলিশের কাছে এদের দৌরাত্ম্যে রাশ টানার আবেদন করেছি।

তবে যাদের বিরুদ্ধে এই অভিযোগ তারা বিষয়টি উড়িয়ে দিচ্ছে। একটি ইউরোপিয়ান স্পোর্টস বাইক কোম্পানির নামে ক্লাব গড়ে তোলা ইঞ্জিনিয়ারিং দ্বিতীয় বর্ষের এক ছাত্র বলে, স্পোর্টস বাইক যেভাবে চালাতে হয় আমরাও সেইভাবেই চালাই। বাস, ট্রাক, রোলার বা ডাম্পার যেমন তার নিজস্ব গতি ও প্রকৃতি অনুয়াযী চলে, ঠিক তেমনি আমাদের বাইকগুলোও তার প্রকৃতি অনুসারে চলে। এজন্য সরকারি নিয়ম মেনে রোড ট্যাক্স দিয়ে বাইক চালানোর অনুমতি নেওয়া হয়েছে। আমাদের অভিভাবকরাও বিষয়টি জানেন। তাছাড়া দুর্ঘটনার কথা ভেবেই হেলমেট সহ অন্য পোশাক পরি। এরপরেও কিছু মানুষ বিনা কারণে আমাদের দোষারোপ করে, যা একেবারেই সঠিক নয়।

ধূপগুড়ি ট্রাফিক গার্ডের ওসি সৈকত ভদ্র অবশ্য এই বাইক বাহিনীর বিরুদ্ধে কড়া পদক্ষেপ করার কথা বলেছেন। তিনি বলেন, মোটর ভেহিকলস আইনের ১৮৪ ধারায় বিপজ্জনক ড্রাইভিংয়ে মামলা করা য়ায়। নাগরিকদের অভিযোগ পেয়ে আমরা কয়েটি বাইকার্স ক্লাবের সদস্যদের ডেকে বুঝিয়েছি। এরপর প্রযোজনে তাদের অভিভাবকদের ডেকে বোঝাব। তারপরেও না বুঝলে বাধ্য হয়ে আইনি পথে যেতে হবে। তাঁর দাবি, শুধুমাত্র রোড ট্যাক্স দিলেই তীব্র গতিতে বাইক চালানোর ছাড়পত্র মেলে না, তা এই বাইকারদের বোঝা উচিত।

তবে এই গতির নেশা আসলে পরিবর্তিত সমাজের সমস্যা বলেই মত সমাজতাত্ত্বিকদের। সমাজতত্ত্বের গবেষক ডঃ কেশবচন্দ্র ভট্টাচার্য বলেন, খোঁজ নিলে দেখা য়াবে এই কমবয়সি ছেলেদের পরিবার আর্থিকভাবে যথেষ্ট সচ্ছল এবং পরিবারের সেই আর্থিক জোরের বিষয়টি জানা। তা এদের মধ্যে এক ধরনের বিশেষ মানসিক অবস্থার জন্ম দিয়েছে। সন্তানকে দামি বাইক দেওয়ার আগে অভিভাবকদের উচিত, নিজের ও চারপাশের সকলের জীবন সম্পর্কে এদের শ্রদ্ধাশীল হওয়ার পরামর্শ দেওয়া।