গবেষণায় হার্ভার্ড পাড়ি দিচ্ছেন জলপাইগুড়ির শ্রীরূপা

557

সৌরভ দেব, জলপাইগুড়ি : তিনি বাবা-মায়ের কাছে বিএসএফ। অর্থাৎ বিশ্বের সেরা ফাঁকিবাজ। তবে জলপাইগুড়ি শহরের বাসিন্দা ডঃ শ্রীরূপা ভট্টাচার্যের যে কেরিয়ারগ্রাফ তাতে তাঁর জীবনে ফাঁকিবাজির অবকাশ আছে কি না সন্দেহ। বাবা-মা দুজনই চিকিৎসক। তাই খুব ছোটবেলা থেকেই ক্যানসার শব্দটির সঙ্গে পরিচিতি। এই রোগের সঙ্গে লড়তে হলে চিকিৎসকের সীমাবদ্ধতা কতটা তা মা ছোটবেলাতেই তাঁকে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন। বুঝেছিলেন, এই রোগের সঙ্গে লড়ার জন্য আজও আমাদের হাতে কোনও নির্দিষ্ট ওষুধ নেই। এই অসাধ্যসাধনকেই সম্ভব করবেন বলে ছোটবেলাতেই পণ করা। সেই শ্রীরূপা এবারে বড় হয়ে প্রচুর পড়াশোনা করে ক্যানসারের প্রতিষেধক নিয়ে গবেষণামূলক কাজ করতে সুদূর মার্কিন মুলুকের হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলে পাড়ি দিচ্ছেন। ক্যানসারের প্রতিষেধক নিয়ে প্রথম পর্যায়ের কাজ নিয়ে তাঁর ইতিমধ্যেই গুয়াহাটি আইআইটি থেকে পিএইচডি সারা। একই বিষয়ে এবারে হার্ভার্ডে দ্বিতীয় পর্যায়ের কাজ করবেন। শ্রীরূপাকে ঘিরে উচ্ছ্বসিত জলপাইগুড়ি তথা গোটা উত্তরবঙ্গ।

জলপাইগুড়ি শহরের ক্লাব রোড এলাকার বাসিন্দা শ্রীরূপার বাবা-মা ডাঃ দেবাশিস ভট্টাচার্য ও ডাঃ সাগরিকা ভট্টাচার্য জলপাইগুড়ি জেলা সদর হাসপাতালে কর্মরত। মায়ের চাকরি সূত্রে শ্রীরূপার একটা সময় ক্যানিংয়ে কেটেছে। খুব ছোট বয়সে সেখানকার একটি বেসরকারি স্কুলে পড়াশোনা শুরু। কর্মসূত্রে মায়ের কলকাতায় বদলির সূত্রে সাউথ পয়েন্ট স্কুলে ভর্তি। ২০০৮ সালে মাধ্যমিকে ৮০ শতাংশ নম্বর। উচ্চমাধ্যমিকে বালিগঞ্জ শিক্ষসদন থেকেও ৮০ শতাংশ নম্বর নিয়ে পাশ। ২০১৩ সালে বোটানি নিয়ে লেডি ব্রেবোর্ন কলেজ থেকে স্নাতক। পরবর্তীতে দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর। এরপর ছোটবেলার সেই স্বপ্নটাকে ধাওয়া।

- Advertisement -

ক্যানসারের প্রতিষেধক নিয়ে পিএইচডি করতে ২০১৫ সালে গুয়াহাটির আইআইটি-তে সুযোগ। টানা পাঁচ বছর লাগাতার খাটনির সুবাদে লক্ষ্যপূরণ। গুয়াহাটিতে যখন লাগাতার খাটাখাটনি চলছিল তখনই ক্যানসারের প্রতিষেধক নিয়ে দ্বিতীয় পর্যায়ের গবেষণার জন্য হার্ভার্ডের ডাক। মাধ্যমিক এবং উচ্চমাধ্যমিকেও রাজ্যের মেধাতালিকায় ছিলেন না। এভাবে এগিয়ে চলাটা কীভাবে সম্ভব হল? শ্রীরূপার মুখে স্বপ্নপূরণের আগাম ঝিলিক। বললেন, নম্বর পাওয়ার জন্য নয়, ছোটবেলা থেকে পড়াশোনাটা করতাম কোনও কিছুকে ভালোভাবে জানার জন্য। তাই মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিকে বেশি নম্বর পাওয়ার মতো করে পড়াশোনা করিনি। কিন্তু কলেজে ভর্তির পর মনে হল, পরীক্ষায় ভালো নম্বর না পেলে ভবিষ্যতে ভালো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তির সুযোগ আসবে না। কলেজে তিন বছরই নিজের বিভাগে প্রথম হয়েছিলাম।

লক্ষ্যপূরণের জন্য বিশ্বের দরজাটা আজ তাঁর সামনে হাট করে খুলে যাওয়ায় বাবা-মায়ের পাশাপাশি গুয়াহাটি আইআইটির অধ্যাপক সিদ্ধার্থশংকর ঘোষকে শ্রীরূপা সমস্ত কৃতিত্ব দিচ্ছেন। বলছেন, আমার গবেষণার একটি ধাপ গুয়াহাটি আইআইটি-তে সারা হয়েছে। কিন্তু গবেষণার পরবর্তী ধাপগুলি পার করতে হলে যে ধরনের পরিকাঠামো প্রয়োজন তা এদেশে নেই। হার্ভার্ড থেকে সুযোগ আসায় আমি কতটা খুশি বলে বোঝাতে পারব না। পোস্ট ডক্টরাল রিসার্চ ফেলো হিসাবে এপ্রিল থেকে সেখানে কাজে যোগ দেব। বাবা-মা খুব খুশি। নিজেরা ডাক্তার বলে মেয়েকে যে ডাক্তার হতে হবে সেকথা কোনওদিন তাঁকে বলেননি। দেবাশিসবাবুর কথায়, যে কোনও ধরনের শিক্ষার গুরুত্ব সমান। তাই তো ছোটবেলা থেকেই বিএসএফ-কে তো এই মন্ত্রে বিশ্বাস করতে শিখিয়েছি। বাবা-মায়ে আদরের মেয়ের মুখে তখন সলজ্জ হাসি।