কৃষকদের কাছে টানতে ঢালাও ঋণ রাজ্যের

দীপ্তিমান মুখোপাধ্যায়, শিলিগুড়ি : শিয়রে বিধানসভা ভোট। তাই এরাজ্যে কৃষকদের পাশে পেতে একদিকে কেন্দ্রের বিজেপি সরকার, অন্যদিকে রাজ্যের তৃণমূল সরকার মরিয়া হয়ে ঝাঁপাচ্ছে। বিজেপি ইতিমধ্যেই ঠিক করে ফেলেছে, প্রধানমন্ত্রী কিষান সম্মান নিধি প্রকল্প এরাজ্যে চালু না করায় এরাজ্যের কৃষকরা প্রত্যেকে কীভাবে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, সেই বিষয়টি একুশের ভোটের ইস্যু হবে। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শা থেকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সবাই তাঁদের ভাষণে বিষয়টি আনছেন। এর পালটা হিসেবে ইতিমধ্যেই মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ে নির্দেশে কৃষকদের ক্রেডিট কার্ড দিতে বিশেষ নির্দেশিকা জারি করা হয়েছে।

এতদিন শুধুমাত্র জমির মালিকানাধীন কৃষকরা কৃষিঋণ পেতে পারতেন। সমবায় দপ্তর থেকে ভাগচাষি বা বর্গাচাষিদের কিছুসংখ্যক ঋণ দেওয়া হত। কিন্তু আরও বেশি সংখ্যক ভাগচাষি যাতে এই ঋণ পান, তার জন্য সমবায় দপ্তরকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মূলত ভাগচাষিদের গোষ্ঠী গঠন করে ঋণ দেওয়া হবে। সমবায় ব্যাংক, সমবায় সমিতির মাধ্যমে তাঁদের ঋণ দেওয়া হবে। এর জন্য চলতি আর্থিক বছরেই আরও দুহাজার কোটি টাকা এই খাতে বরাদ্দ ধরা হয়েছে। সরকারের পদস্থ কর্তাদের বক্তব্য, এর মাধ্যমে আরও বেশি সংখ্যক উপভোক্তা তৈরি করা সম্ভব হবে। মূলত কৃষকদের কাছে টানতেই কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে কার্যত লড়াইয়ে নেমেছে তৃণমূল সরকার। শুধু তাই নয়, গরিব মহিলাদের ভোটব্যাংক সুনিশ্চিত করতে স্বনির্ভর গোষ্ঠীগুলিকেও বেশি পরিমাণে ঋণ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যেই এই নিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর কাছে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। রাজ্যে ১১ হাজার ৩৪৫টি গোষ্ঠীকে চিহ্নিত করা হয়েছে। আরও বেশি সংখ্যক গোষ্ঠী চিহ্নিত করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

- Advertisement -

অক্টোবরে উত্তরবঙ্গ সফরে এসে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রশাসনিক বৈঠকে কৃষিঋণকে বিশেষ গুরুত্ব দেন। গত বছর লোকসভা ভোটে উত্তরবঙ্গে তৃণমূলের ভরাডুবি হয়েছে। তাই উত্তরের কৃষকদের কাছে টানতে কৃষিঋণকেই ভরসা করছেন তৃণমূলনেত্রী। প্রশাসনিক সূত্রের খবর, গত আর্থিক বছরে এই রাজ্যে সমবায় দপ্তরের মাধ্যমে রাজ্যে আট হাজার কোটি টাকা কৃষিঋণ দেওয়া হয়েছিল। তাতে অধিকাংশই জমির মালিকানাধীন কৃষক ছিলেন। কিন্তু ভাগচাষিদের ঋণ দেওয়ার ব্যাপারে বিশেষ কোনও নির্দেশিকা ছিল না। এবার বেশিসংখ্যক ভাগচাষিদের ঋণ দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছে। সমবায় দপ্তরের মাধ্যমে তাঁরা যেমন ঋণ পাবেন, তেমনই বিভিন্ন রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের মাধ্যমেও তাঁরা যাতে এই ঋণ পান, তার জন্যও রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের কর্তাদের নির্দেশ দিয়েছে নবান্ন। রাজ্য সমবায় দপ্তর ভাগচাষিদের কৃষিঋণের জন্য দুহাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত খরচ করবে বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

সমবায় দপ্তর সূত্রে জানা গিয়েছে, করোনা পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে উত্তরবঙ্গের কোচবিহারের হলদিবাড়ি ও জলপাইগুড়ির বিস্তীর্ণ এলাকায় ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। তার ফলে অনেক কৃষকের পাশাপাশি ভাগচাষিরাও চরম সমস্যায় পড়েছেন। এই মুহূর্তে তাঁদের পাশে না দাঁড়ালে আগামী মরশুমে তাঁদের পক্ষে চাষ করা কঠিন হয়ে যাবে। মুখ্যমন্ত্রীর কানেও এই খবর পৌঁছেছে। সেই কারণে তাঁদের কৃষিঋণের আওতায় আনার লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছে। এতে ভোটের মুখে কৃষকদের পাশে থাকার বার্তা যেমন দেওয়া যাবে, তেমনই কেন্দ্রীয় সরকারের প্রধানমন্ত্রী কিষান সম্মান নিধি প্রকল্পকেও পালটা চ্যালেঞ্জ জানানো যাবে। রাজ্যের সমবায়মন্ত্রী অরূপ রায় বলেন, ২০১১ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকেই মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কৃষকদের জন্য একাধিক প্রকল্প নিয়েছেন। কৃষকদের পাশে তিনি সবসময়ই রয়েছেন। কিষান ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে কৃষকদের ঋণ দেওয়া নিয়ে বিশেষ গুরুত্ব প্রথম থেকেই আমাদের সরকার দিয়েছে। এবার ভাগচাষিদের বেশি মাত্রায় ঋণ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তার জন্য আমরা মুখ্যমন্ত্রীর কাছে প্রস্তাব পাঠিয়েছি। এর জন্য অতিরিক্ত খরচও হবে। এতে ভাগচাষিরা উপকৃত হবেন। দ্রুত এই প্রকল্প কার্যকর করার চেষ্টা চলছে।

বিহারে জয়ে পর বিজেপি শিবির উল্লসিত। রাজনৈতিক মহল মনে করছে, এই রাজ্যেও উত্তরবঙ্গ তো বটেই দক্ষিণবঙ্গেও তৃণমূলের গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে বিজেপি। সিঙ্গুর ও নন্দীগ্রামের কৃষক আন্দোলনকে সামনে রেখেই তৃণমূল এই রাজ্যে ক্ষমতায় এসেছে। তাই ক্ষমতায় আসার ১০ বছর পর ফের অগ্নিপরীক্ষায় সেই কৃষকদের ঢাল করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে তৃণমূল। সেই কারণেই ভাগচাষিদের কৃষিঋণের পরিমাণ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সরকারি সূত্রের খবর, ইতিমধ্যেই প্রতিটি জেলায় ঋণ নিয়ে চাষ করতে আগ্রহী ভাগচাষিদের নামের তালিকা তৈরির জন্য দলীয় নেতৃত্বকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ওই ভাগচাষিরা যাতে কোনওভাবে ঋণ নিতে গিয়ে হেনস্তার শিকার না হন, সেই দিকেও নজর রাখতে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে জেলা প্রশাসনকেও এই প্রকল্পে জোর দিতে বলা হয়েছে।