শতবর্ষে হেমন্ত: রাত সুহানি হ্যায়

509

সাল ১৯৫৯। ঢাকা থেকে কলকাতায় পা রাখলেন দুই অভিন্নহৃদয় বন্ধু। দুই গানপাগল সুরকার রবিন ঘোষ ও মহম্মদ মহসলিউদ্দিন। মহসলিউদ্দিন তখন পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের জনপ্রিয় সুরকার। রবিন ঘোষ কিংবদন্তি হয়ে ওঠেননি তখনও। ঢাকা রেডিও’তে কাজ করার পাশাপাশি মহসলিউদ্দিনের সহযোগী হিসেবে তিনি হাত পাকাচ্ছেন দুই বাংলার চলচ্চিত্র সংগীতের দুনিয়ায়। ‘সুরের ডানা’য় ভর করে গড়ে উঠেছিল তাঁদের বন্ধুত্ব।

একটি বিশেষ কাজ হাতে নিয়ে তাঁরা এসেছেন কলকাতায়। ‘কিংবদন্তি’ দুই শিল্পীকে দিয়ে গান গাওয়াতে। সেই গানের সুরকার মহসলিউদ্দিন স্বয়ং। একটি উর্দু সিনেমায় ব্যবহৃত হবে সেই গান। সিনেমাটি বাংলাদেশের পটভূমিকায় নির্মিত হলেও তা কিন্তু ভারত বা বাংলাদেশের নয়। পাকিস্তানের। তাই দুজনের মনেই অস্বস্তি, এই কাজে রাজি হবেন তো শিল্পীরা? তবু তাঁরা মনে-প্রাণে বিশ্বাস করেন, সংগীতের কোনও ধর্মজাতদেশ হয় না। দেশকালের গণ্ডিতে তাঁকে বাধা অসম্ভব। তাই মনে আশা, যে খালি হাতে ফিরতে হবে না তাঁদের। নিশ্চয়ই রাজি হবেন সেই দুই কিংবদন্তি শিল্পী। তাঁরা দুই বাংলা তথা তামাম হিন্দুস্তানের দুই প্রবাদপ্রতিম নক্ষত্র-হেমন্ত ও সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়।

- Advertisement -

সে এক ভারি অদ্ভুত সময়। বলিউডে রফি সাহেব সুর লাগালে সেই সুরে নেচে ওঠে করাচি, লাহোর, ইসলামাবাদ। অদূর লাহোর থেকে আহমেদ রুশদী, নূরজাহান, মেহদি হাসান সুর লাগালে মাতোয়ারা হন এদেশের আবালবৃদ্ধবনিতা। রুনা লায়লা বা ফিরদৌসী বেগমের মত শিল্পীরা রীতিমতো শাসন করেছেন ঢাকা, মুম্বই, লাহোরকে। সুরের অনাবিল আহবানে উপড়ে যাচ্ছে কাঁটাতার। পদ্মার পানি মিশে যাচ্ছে গঙ্গায়, আরব সাগরে। চিনাব, বিয়াস, রবির জল ধাক্কা দিচ্ছে আদিগঙ্গায়। মিলেমিশে একাকার তিন দেশ (যদিও বাংলাদেশ তখনও স্বাধীনতা পায়নি, পূর্ব পাকিস্তান রূপেই পরিচিত)। রাজনৈতিক উত্থানপতন, মসনদ রদবদলের মত একাধিক ঘটনায়, পূর্ব পাকিস্তান বারবার উত্তপ্ত হলেও সংগীতের ধারা সেখানে বিঘ্নিত হয়নি। দুই দেশের শিল্পীরা কাঁটাতার পিছনে ফেলে পৌঁছে যাচ্ছেন ‘আওয়ামে’র কাছে। তৈরি হচ্ছে ইতিহাস। এখানেই হয়তো সংগীতের সার্থকতা।

নাহ, সে যাত্রায় খালি হাতে ফিরতে হয়নি সেই দুই গানপাগল মানুষকে। অকৃপণ ভালোবাসা ও স্নেহে তাদের ঝুলি ভরে দিয়েছিলেন হেমন্ত এবং সন্ধ্যা। কলকাতার বুকেই রেকর্ড হয়েছিল সেই সিনেমাটির অন্যতম সেরা গানগুলি। কলকাতা থেকে ফেরত আসার সময় মহসলিউদ্দিন ও রবিন ঘোষের তাই বারবার মনে গিয়েছিল আর এক অগ্রজ গায়ক ও প্রথিতযশা বাঙালি অভিনেতা পাহাড়ি সান্যালের আশ্বাসবাণী- ‘এগিয়ে যাও, হেমন্ত কাউকে খালি হাতে ফেরায় না। তোমরাও ফিরবে না।’ পাহাড়ি বাবুর ‘বরাভয়’ মেনেই তাঁদের কলকাতা আগমন ও ইতিহাস রচনা।’

১৯৬০ সালে পাকিস্তানে মুক্তি পায় পরিচালক শৌকত হাশমির উর্দু ছায়াছবি ‘হমসফর’। লাহোরের ‘ইজ্জত ফিল্ম করপোরেশনে’র প্রযোজনায় নির্মিত সোশ্যাল ড্রামা ‘হমসফরে’ অভিনয় করেছিলেন ইয়াসমিন, আসলাম পারভেজ, আসাদ জাফরি, নাজার এবং নিঘাত সুলতানার মত বিখ্যাত শিল্পীরা। ছবিটির সংগীত পরিচালনা করেন বাঙালি সুরকাদ মহম্মদ মহসলিউদ্দিন, সহযোগী রবিন ঘোষ ও গীতিকার ছিলেন ফয়াজ হাশমি, তানভীর নাখভি, শাহির সিদ্দিকির মত ‘শায়ের’রা। সিনেমায় ছিল মোট ১০টি গান। গেয়েছিলেন জুবেদা খানুম, নাহিদ নিয়াজি, ফিরদৌসি বেগম ও সালিম রাজার মত বিখ্যাত শিল্পীরা। এবং অবশ্যই হেমন্ত মুখোপাধ্যায় ও সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়। ভারতের এই দুই শিল্পী সেই প্রথম ও শেষবার গান গেয়ে ছিলেন কোনও পাকিস্তানি সিনেমার জন্য। রচিত হল নয়া ইতিহাস।

ফয়াজ হাশমির কলমে ‘রাত সুহানি হ্যায় সোয়া সোয়া চাঁদ হ্যায়’ গানটি গেয়ে সাড়া ফেলে দিয়েছিলেন হেমন্ত। সন্ধ্যা গেয়ে ছিলেন দুটি গান। ‘আঁখিয়া ছলকে মেরা দিল ধড়কে’ ও ‘সাঁওয়ারে আও রে’। টাইটেল কার্ডে তাদের নামের পাশে ‘ইন্ডিয়া’ লেখা হয়েছিল। শৌকত হাশমির ‘হমসফর’ পাক জনমানসে তেমন ছাপ ফেলতে না পারলেও ব্যাপক হিট হয়েছিল এই সিনেমার গানগুলি। বিশেষ করে হেমন্ত ও সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের গাওয়া গানগুলি আজও সেখানে মানুষের মুখেমুখে ফেরে। সম্প্রতি বিখ্যাত পাক গায়ক ও হেমন্ত অনুরাগী সলমন আলভি তাঁর এক সাক্ষাৎকারে এই গানটির স্মৃতিচারণা করেন। শ্রদ্ধা জানান হেমন্তবাবুর স্মৃতির উদ্দেশ্যেও।

দুর্ভাগ্যের বিষয়, এই গানগুলির কথা আজ আর কেউ বলেনা। দুই কিংবদন্তি বাঙালি শিল্পী হেমন্ত ও সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠের জাদুতে আজও তিন দেশের অসংখ্য সংগীতপ্রিয় মানুষরা মজে। কিন্তু এমন গান কালের গর্ভে কোথায় যেন হারিয়ে গেল। ‘টলিউড’ ও ‘বলিউডে’র পাশাপাশি ঢাকা ও পাকিস্তানের মাটিতেও সৃষ্টি হয়েছিল হেমন্ত-সন্ধ্যার অমর সুরেলা আখ্যান। ইতিহাস ভুলেছে সেই চির কালজয়ী অধ্যায়। হেমন্ত মুখোপাধ্যায় বা সন্ধ্যাদেবীর মত ক্ষণজন্মা শিল্পীরা আজও দুই বাংলার গানপাগল মানুষের স্বর্ণালি স্মৃতির মণিকোঠায় জায়গা করে নিলেও কোথাও যেন অলক্ষ্যে, ব্রাত্য রয়ে গিয়েছেন মহসলিউদ্দিন বা রবিন ঘোষের মত প্রসিদ্ধ সুরকারেরা।

হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের (১৬ জুন ১৯২০-২৬ সেপ্টেম্বর ১৯৮৯) জন্ম শতবর্ষের পুণ্যতিথিতে আমি আশাবাদী, একদিন ইতিহাসের পাতা থেকে ধূলো ঝেড়ে সেই সব সৃষ্টি, রচনা নতুন করে খুঁজে বের করবে বর্তমান প্রজন্ম।

ঋণঃ সুখেন্দুশেখর রায়, রাজ্যসভা সাংসদ