‘স্বর্গের’ কুঠুরিতে রক্তমাংসের উমাদেবীদের চোখের কোণে জল

146

বীরপাড়া: কারও বয়স ৮০ পেরিয়েছে অনেকদিন আগেই। কারও ৬৫ কিংবা ৬০ বছর। ওঁনারাও কারও না কারও মা। তাঁদেরও ছিল সংসার। ধূসর স্মৃতির মণিকোঠায় সংসারের স্মৃতি এখন আবছা। তবে বড্ড স্পষ্ট ছেলে-মেয়েদের মুখগুলি। ওঁদের যৌবনে পুজোর আনন্দে মাততেন ওঁনারাও। সে সবই এখন অতীত। তবে ছেলে-মেয়েদের কথা মনে পড়লে এখনও চিকচিক করে অশ্রু। বীরপাড়ার ডিমডিমার সমাজকর্মী সাজু তালুকদারের হেভেন শেল্টার হোমের ১৮ জন আবাসিকের মধ্যে ৯ জনই মহিলা। তাঁদের মধ্যে বেশিরভাগই বৃদ্ধা। ভরা সংসারের পাকদন্ডী বেয়ে এগোতে এগোতে কখন যে সংসার থেকেই ছিটকে গিয়েছেন, এখন আর মনে নেই তাঁদের। শেল্টার হোমটাই এখন তাঁদের বাড়ি। ছোটো ছোটো কুঠুরিতে দিন-রাত কাটে। ওখানেই মাঝে মাঝে জমে আড্ডা, যার বড় অংশ জুড়ে থাকে শুধুই দীর্ঘশ্বাস। গা ঘেঁষে বয়ে গিয়েছে ডিমডিমা নদী। একটু দূরেই ভূটান পাহাড়ের সারি। নীচে শুধুই সবুজ আর সবুজ! এমন নৈসর্গিক দৃশ্যপটে দাঁড়িয়ে থাকা সবুজ রঙের লম্বা বাড়িটার নাম ‘হেভেন শেল্টার হোম’। ‘হেভেন’, অর্থাৎ ‘স্বর্গ’। ৪ বছর ওই স্বর্গেই আছেন রক্তমাংসের উমাদেবী। ডিমডিমা নদীটার তীরে এখন কাশফুলের ছড়াছড়ি। মৃণ্ময়ী উমার আরাধনায় ঢাকে কাঠি পড়ে গিয়েছে। তবে, স্বর্গে বসেও পুজোর দিনগুলিতে রক্তমাংসের উমাদেবীর অশ্রুসিক্ত চোখ সারাদিনই খোঁজে সন্তানদের। তাঁর বাড়ি নাকি ছিল বিহারে। তবে, ঠিকানাটাই ভুলে গিয়েছেন তিনি।

সবচেয়ে প্রবীণা অশীতিপর বারুণী চৌধুরী। ঠিকানা ভুললেও তাঁর মনে আছে, অসমে রয়েছে তাঁর বসতভিটে। স্বামী হারিয়েছেন অনেকদিন আগেই। ছেলেকে গর্ভে ধারণ করলেও ঘরে বউ আনার পর ছেলের সংসারে ঠাঁই হয়নি তাঁর। কীভাবে কখন যে বাড়ি থেকে ছিটকে ডিমডিমায় পৌঁছান, এখন আর স্মৃতিতে নেই তাঁর। তবে পুজোর প্রাক্কালে ছেলের প্রসঙ্গ উঠতেও ভিজে গেল বারুণীদেবীর চোখ। ছেলেকে দেখেননি অনেকদিন। ছেলে হয়তো এসময়টা মৃন্ময়ীর আরাধনায় ব্যস্ত। তবে আর ঘরে ফিরতেও চান না বারুণীদেবী। ‘এখানেই ভালো আছি’, মন্তব্য তাঁর। রয়েছেন সুদিপা চট্টোপাধ্যায়ও। চেহারায় বোঝাই যায়, স্বচ্ছল পরিবারের সদস্য ছিলেন তিনি। বছর পঁয়ষট্টির সোমাই খাড়িয়া পড়ে ছিলেন বীরপাড়া হাসপাতালের এককোণে। চার বছর আগে তাঁকে তুলে নিয়ে আসেন সাজু তালুকদার। সুকরি খাড়িয়া সহ ওঁনারা সকলেই ভুলে গিয়েছেন ঠিকানা। রয়েছেন দুই যুবতী নমিতা বোস ও আয়েশা। তাঁদের কারও ঠিকানা জানা যায়নি। সাজু তালুকদার জানান, অনেক চেষ্টা করেও তাঁদের ঠিকানা মেলেনি।

- Advertisement -