বাগ্রাকোট থেকে সোজা নাথু লা, বিকল্প সড়ক জাগাচ্ছে আশার আলো

192

অনুপ সাহা, চুইখিম : চুইখিম। জায়গাটার নাম হয়তো অনেকেরই অজানা। ডুয়ার্সের বাগ্রাকোট থেকে পাহাড়ি পথ বেয়ে অনেকটা উপরে উঠলে দেখা মিলবে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর এই জায়গাটির। এই চুইখিম পেরিয়ে অদূরভবিষ্যতে চলে যাওয়া যাবে ইন্দো-চিন সীমান্তের নাথু লা-তেও। কী, শুনতে অবাক লাগছে তাই তো! আসলে, একেবারে নিঃশব্দেই কালিম্পং জেলার পাহাড়জুড়ে বিশাল এক কর্মযজ্ঞ চলছে। ডোকালাম, নাকু লা, নাথু লা-র মতো ইন্দো-চিন সীমান্তগুলোর সুরক্ষার স্বার্থে মূলত সামরিক প্রয়োজনেই নতুন করে দুই লেনের সড়ক তৈরি হচ্ছে। আগামীদিনে এই সড়কপথেই পৌঁছে যাওয়া যাবে সিকিমের নাথু লা-য়।

কেন্দ্রীয় সরকারের ভূতল পরিবহণমন্ত্রকের অধীনস্থ ন্যাশনাল হাইওয়ে অ্যান্ড ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশন লিমিটেড (এনএইচআইডিসিএল)-এর তত্ত্বাবধানে ডুয়ার্সের বাগ্রাকোটের চাঁদমারি থেকে ইন্দো-চিন সীমান্তের নাথু লা পর্যন্ত প্রায় ২৫০ কিমি দীর্ঘ বিকল্প জাতীয় সড়ক ৭১৭-এ  নির্মাণের কাজ অনেকটাই এগিয়ে গিয়েছে। সড়ক নির্মাণের কাজে ব্যবহৃত বালি-পাথর ইত্যাদির গুণগত মান নিয়ে একাধিক অভিযোগ উঠলেও নির্মাণকারী সংস্থার তরফে সমস্ত অভিযোগ উড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এনএইচআইডিসিএল-এর নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক আধিকারিক বলেন, সমস্ত নিয়মকানুন মেনে কেন্দ্রীয় সরকারের অধীনস্থ একাধিক ল্যাবরেটরিতে নির্মাণসামগ্রী পরীক্ষার পর ব্যবহার করা হচ্ছে। এখানে কোনও ফাঁক নেই। একইভাবে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন নির্মাণকারী সংস্থার প্রোজেক্ট ম্যানেজার রাজীব কুমার। তিনি বলেন, এনএইচআইডিসিএল-এর নিজস্ব এবং পাটনা শহরের র্যাডিকন নামের দুটি গবেষণাগারে পরীক্ষা করিয়ে সড়ক নির্মাণকাজের সামগ্রী ব্যবহার করা হচ্ছে।

- Advertisement -

শুরুর দিকে কালিম্পং জেলার কয়েকটি পাহাড়ি গ্রামে জমিজট ও বন দপ্তরের অনুমতির জন্য কিছুটা পিছিয়ে পড়লেও ইদানীং অত্যাধুনিক মেশিনপত্র কাজে লাগিয়ে প্রচণ্ড গতিতে এগিয়ে চলেছে নির্মাণকাজ। এনএইচআইডিসিএল-এর তরফে জানানো হয়েছে, বর্ষাকালে ১০ নম্বর জাতীয় সড়কে ধস নেমে প্রায়শই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে বাংলা-সিকিম যোগাযোগ। নতুন এই সড়ক তৈরি হয়ে গেলে সেই সমস্যা থেকে মুক্তি মিলবে। এছাড়া ১০ মিটার চওড়া বিকল্প এই জাতীয় সড়ক দিয়ে সেনাবাহিনীর ভারী যানবাহনও যাতে নাথু লা সীমান্তে নির্বিঘ্নে পৌঁছে যেতে পারে সেই বিষয়টিও পুরো পরিকল্পনায় অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে বলে কেন্দ্রীয় সংস্থাটির সূত্র জানিয়েছে। প্রস্তাবিত এই সড়কপথের মধ্যে এ রাজ্যে প্রায় ৬৭ কিমি সড়ক তৈরি হবে। ১৩ কিমি করে মোট পাঁচটি ধাপে এই কাজ করা হচ্ছে। শুধুমাত্র বাগ্রাকোটের চাঁদমারি থেকে প্রথম ১৩ কিমি সড়ক নির্মাণের জন্য খরচ ধরা হয়েছে ২৬১ কোটি টাকা। সেই হিসেবে ২৫০ কিমি দৈর্ঘ্যের পুরো সড়ক নির্মাণের আনুমানিক ব্যয় যে কয়েক হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে, তা নিয়ে সন্দেহ নেই।

নতুন এই সড়কটি ওদলাবাড়ি-বাগ্রাকোটের মধ্যবর্তী চাঁদমারি গোলাই থেকে একটি উড়ালপুলের মাধ্যমে রেললাইন পেরিয়ে বাগ্রাকোট চা বাগান, চুইখিম, নিমবং, বরবট, পাবরিংটার, দারাগাঁও, লোলেগাঁও প্রভৃতি পাহাড়ি গ্রাম  হয়ে সিকিম সীমান্তের ঋষিখোলা পর্যন্ত পৌঁছানোর পর পেডং, গ্যাংটক হয়ে নাথু লা পর্যন্ত যাবে।এই মুহূর্তে কালিম্পং জেলার চুইখিম, বরবট, নিমবং পাহাড়ের প্রতিটি বাঁকে শোনা যাচ্ছে ভারী মেশিনের আওয়াজ। কোথাও দুটো পাহাড়ের মাঝখান দিয়ে রাস্তা কাটা হচ্ছে, কোথাও আবার চলছে লেবেলিংয়ের কাজ। পথের দুধারে ধস ঠেকাতে ইতালির প্রযুক্তি ব্যবহার করে ব্রেস্ট ওয়াল তৈরির কাজও চলছে জোরকদমে। বিকল্প এই নতুন সড়কপথ যে আগামী কয়ে বছরের মধ্যে সিকিমের সঙ্গে এ রাজ্যের সড়ক যোগাযোগে  যুগান্তকারী এক পরিবর্তন নিয়ে আসবে শুধু তাই নয়, বাগ্রাকোট, চুইখিম, বরবট, নিমবং প্রভৃতি পাহাড়ি গ্রামগুলোতে পর্যটন প্রসারেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে স্থানীয়দের মত।

বাগ্রাকোটের বাসিন্দা তথা গোর্খা জনমুক্তি মোর্চার বিনয় গোষ্ঠীর ডুয়ার্সের কোঅর্ডিনেটর বিনোদ ঘাতানি বলেন, একদিকে যেমন সড়কের নির্মাণকাজ শুরু হওয়ার ফলে এলাকার বহু বেকার যুবকের কর্মসংস্থান হয়েছে তেমনই আগামীদিনেও এই সড়ক বাগ্রাকোট, ওদলাবাড়ির অর্থনীতিতে জোয়ার নিয়ে আসবে। প্রত্যন্ত পাহাড়ি বস্তির জনগণ যেমন তাঁদের নিত্য প্রয়োজনে নতুন সড়ক ধরে সহজেই ওদলাবাড়ি ও বাগ্রাকোটের বাজারে পৌঁছে যাবেন, একইভাবে পর্যটকেরাও কুলু-মানালির মতো পাহড়ের ঢাল বেয়ে তৈরি প্রশস্ত সড়ক ধরে তাঁদের গন্তব্যে পৌঁছে যাবেন। সবমিলিয়ে সড়ক নির্মাণের আগামী দেড় বছরের সম্ভাব্য সময়সীমা পেরোনোর অপেক্ষায় এখন থেকেই দিন গুনছেন এই এলাকার বাসিন্দারা।