চা শ্রমিকদের বারোমাস্যা এবার সিনেমার পর্দায়

223
ছবির একটি দৃশ্য

মোস্তাক মোরশেদ হোসেন, রাঙ্গালিবাজনা : এবার সেলুলয়েডে বন্ধ চা বাগান শ্রমিকদের দুর্দশার ছবি। ৩০ মিনিটের ছবিতে ধরা পড়েছে পেটের দায়ে ভিনরাজ্যে পাড়ি দিচ্ছেন বন্ধ চা বাগানের শ্রমিক পরিবারের এক যুবক। রঙিন জীবনে বুঁদ হয়ে তিনি ভুলে যান পরিবারকে। অনটনে জর্জরিত বাবাকে বাধ্য হয়ে পাড়ি দিতে হয় ভিনরাজ্যে। লকডাউনের জেরে ক্রোশের পর ক্রোশ হেঁটে বাড়ি ফিরে অবশেষে অসুস্থ হয়ে মৃত্যু হয় বাবার। নেপালি ভাষায় তৈরি একটি স্বল্পদৈর্ঘ্যের সিনেমায় উত্তরবঙ্গের বন্ধ, অচল চা বাগানের শ্রমিকদের এমন দুর্দশার ছবি এই প্রথম। কয়েদিন পরই বীরপাড়া নেপালি হাইস্কুলে মুক্তি পাবে ছবিটি। চা শ্রমিকদের বারোমাস্যার পাশাপাশি লকডাউনের জেরে চা শ্রমিকদের জীবনে নেমে আসা আঘাতের কথাও ঠাঁই পেয়েছে সিনেমায়। সিনেমাটির চিত্রনাট্য লিখেছেন আলিপুরদুয়ার জেলার মাদারিহাটের ধুমচিপাড়া চা বাগানের বাসিন্দা তথা শিলিগুড়ি কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ছাত্র প্রতীক কামি। পরিচালনা ও ক্যামেরা নির্দেশনার কাজ করেছেন বীরপাড়ার দুই প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক কৃষ্ণ ছেত্রী ও আমির সুব্বা। মূল ভূমিকায় অভিনয় করেছেন ধুমচিপাড়া চা বাগানেরই অবসরপ্রাপ্ত কর্মী বিজয় লোহারা। শুটিং হয়েছে বীরপাড়া চা বাগান ও ধুমচিপাড়া চা বাগানে। সিনেমাটির প্রযোজক বীরপাড়ার বুদ্ধিমান লামা বলেন, উত্তরবঙ্গের চা শ্রমিকদের জীবনের চালচিত্র তুলে ধরতেই সিনেমাটি করেছি আমরা। মোবাইল ক্যামেরা এবং ডিএসএলআর ব্যবহার করে  শুটিং হয়েছে  মেরো অন্তিম পত্র  নামে সিনেমাটির। একসময় ধুমচিপাড়া চা বাগানটি বন্ধ ছিল। সেই সময়ে প্রেক্ষাপটে একটি কাল্পনিক শ্রমিক পরিবারের কাহিনী তুলে ধরা হয়েছে সিনেমায়। চা বাগান বন্ধ হওয়ার পর শ্রমিক বাবা-মায়ের একমাত্র ছেলে পাড়ি দেয় ভিনরাজ্যে। বাবা-মা ছেলের ফেরার  আশায় প্রতীক্ষা করেন মাসের পর মাস। কিন্তু ছেলে আর ফেরে না। ছেলে না ফেরায় ঋণে জর্জরিত হয়ে বাবাও একসময় পাড়ি দেন ভিনরাজ্যে। কিন্তু কিছুদিন পরই শুরু হয় লকডাউন। ভিনরাজ্য থেকে ঘরে ফিরতে সরকারি সহযোগিতা মেলেনি। ফলে রেললাইন ধরে হেঁটে বাড়ি ফেরেন তিনি। ততদিনে চা বাগানটি খুলে গিয়েছে। কিন্তু কাজ আর মেলেনি। একসময় অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি। তাঁর মনের সব কথা স্ত্রীর উদ্দেশ্যে লিখে রেখে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন তিনি।

চিত্রনাট্যের লেখক প্রতীক কামির বাবা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক। তবে,  চা বাগানের বাসিন্দা হওয়ায় শ্রমিকদের জীবনসংগ্রামকে অত্যন্ত কাছ থেকে দেখেছেন প্রতীক। ২০১৫ সাল থেকে একাধিকবার বন্ধ হয়েছে ও খুলেছে ধুমচিপাড়া চা বাগানটি। বীরপাড়া চা বাগানটি এখনও পর্যন্ত বন্ধ রয়েছে। বীরপাড়া চা বাগানের অনেক শ্রমিক এখনও ভিনরাজ্যে রয়েছেন। ধুমচিপাড়া চা বাগানটি বন্ধ হওয়ার পর অনেকেই পাড়ি দেন ভিনরাজ্যে। বাগান খোলার পর শ্রমিকদের একাংশ ও লকডাউন শুরু হওয়ার পর আরও কিছু অংশ ফিরে আসেন। কিন্তু ভিনরাজ্য থেকে ফেরা চা বাগানের বাসিন্দারা এখনও কর্মসংস্থানের সমস্যায় ভুগছেন। প্রতীকের চিত্রনাট্যে এসবই ফুটে উঠেছে। বীরপাড়ার দলমোর চা বাগানের বাসিন্দা তথা শিক্ষক দিলীপ শর্মা ঘিমিরে বলেন, উত্তরবঙ্গের চা বাগানের শ্রমিকরা যুগ যুগ ধরে নানা সমস্যায় জীবন কাটাচ্ছেন। তাঁদের জীবনের ছবি ওই সিনেমায় তুলে ধরা হয়েছে। এটি প্রশংসনীয় প্রচেষ্টা।

- Advertisement -