খেলা ছেড়ে দাঁড়িপাল্লা নিয়ে লড়ছে জলপাইগুড়ির কৌশিক

167

জ্যোতি সরকার, জলপাইগুড়ি : বয়স মাত্র ১০ বা ১১। এই বয়সে মাঠে গিয়ে খেলাধুলো করা যে কোনও ছেলেমেয়ের পক্ষেই স্বাভাবিক। কিন্তু জলপাইগুড়ির কৌশিকের সেই ভাগ্য কোথায়? বাড়িতে উপার্জনের একমাত্র ভরসা বাবা দীপক রায়। বড় ডাকঘরের সামনে রাস্তার এক কোণে  দীপকবাবুর ছোট একটা সবজির দোকান আছে। সেখান থেকে যা উপার্জন হয়, তা দিয়ে সংসার চলে কৌশিকদের। তবে ইদানীং বয়স হয়েছে দীপকবাবুর। এখন আর আগের মতো দোকানে সারাক্ষণ বসে থাকতে পারেন না। এদিকে, দোকান না খুললে উপার্জনের একমাত্র রাস্তাও যে বন্ধ হয়ে যাবে। তাই বাবার পাশে দাঁড়াতে নিজেই দোকানে বসার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কৌশিক। পাকা দোকানির মতো দাঁড়িপাল্লায় ওজন মেপে সবজি বিক্রি করছে সে। তবে দোকানে আসা লোকজন যখন তার কাছে পড়াশোনার খবর জানতে চায়, তখন ভীষণ মন খারাপ হয় কৌশিকের।

জলপাইগুড়ি পুরসভা লাগোয়া সানুপাড়ার বাসিন্দা এই ছোট ছেলেটি জলপাইগুড়ি হাইস্কুলের পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র। করোনার কারণে এখন স্কুল বন্ধ ঠিকই, কিন্তু স্কুল খুলে গেলে দোকান ছেড়ে আদৌ নিয়মিত স্কুলে যাওয়া হবে কি না, তা নিয়ে চিন্তায় রয়েছে কৌশিক। তবে যতই প্রতিকূলতা আসুক না কেন, পড়াশোনা চালিয়ে যেতে কৌশিক দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।

- Advertisement -

নিজের সাইকেল নেই বলে রোজ দেড় কিমি রাস্তা হেঁটে স্কুলে যায় কৌশিক। সে বলে, আমাদের কাঁচা বাড়ি। ঝড়-বাদল মাথায় নিয়ে ওই কাঁচা বাড়িতেই আমরা থাকি। সংসারে উপার্জন বলতে বাবার ওই সবজির দোকানই ভরসা। কিন্তু ইদানীং বাবা আর সেভাবে দোকানে বসতে পারেন না। তাই আমি বাবাকে সাহায্য করতে নিজেই দোকানে বসছি। তবে যত বাধা আসুক না কেন, আমি আমার পড়াশোনা চালিয়ে যাব। বাবা দীপকবাবুও ছেলেকে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে সমানভাবে উত্সাহ জুগিয়ে যান। প্রতিদিন সকাল ৭টায় দোকানে আসে কৌশিক। বেলা ১১টা পর্যন্ত সে একাই দোকান সামলায়। তারপর দীপকবাবু দোকানে এলে বাড়িতে গিয়ে নাওয়া-খাওয়া সেরে ফের দুপুর ২টোয় দোকানে আসতে হয় কৌশিককে। রাত ৯টা পর্যন্ত চলে লড়াই।

দোকান ছোট হলেও সব ধরনের সবজি পাওয়া যায় কৌশিকদের দোকানে। দাঁড়িপাল্লায় ওজন করার ক্ষেত্রে ইতিমধ্যেই সে বেশ দক্ষ হয়ে উঠেছে। কৌশিকের এই লড়াইয়ে কথা অবশ্য জানেন তার স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষিকারা। দুঃস্থ এই ছাত্রটির পাশে দাঁড়িয়ে তাকে সহায়তা করেছেন তাঁরা। তবে খেলা বাদ দিয়ে দোকানে বসে সবজি বিক্রি করতে কী কারও ভালো লাগে। কৌশিকেরও লাগে না। কিন্তু বাবা-মা, সংসারের কথা ভেবে সব মানিয়ে নিয়েছে সে।