পলাশবাড়িতে টোল আছে, কিন্তু পড়ুয়া নেই

138

প্রণব সূত্রধর, আলিপুরদুয়ার :  দীর্ঘদিন ধরে সরকারি সাহায্যের অভাব, পরিকাঠামোর সমস্যার জেরে আজ বন্ধের মুখে আলিপুরদুয়ার শহরের পলাশবাড়ির দ্বারিকানাথ চতুষ্পাঠী (সংস্কৃত কলেজ)। এক সময় উত্তরবঙ্গের সংস্কৃত ভাষাচর্চার অন্যতম ক্ষেত্র ছিল এই টোল। ২০০৭ সাল থেকে সরকারিভাবে টোলগুলিতে পরীক্ষা বন্ধ হয়ে গিয়েছে। ফলে নতুন করে কোনও পড়ুয়াও ভর্তি হয় না। এক সময় যে টোলের সঙ্গে বিশিষ্ট ব্যক্তিরা যুক্ত ছিলেন, এখন সেই টোলের কথা ভুলতে বসেছে মানুষ। তবে সম্প্রতি টোলের পরিচালনার সঙ্গে যুক্তরা রাজ্য সরকারের সঙ্গে টোল খোলা নিয়ে আলোচনা করেছেন। প্রাক্তন শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায় এই নিয়ে আশ্বাসও দিয়েছেন বলে জানিয়েছেন তাঁরা। বিধানসভা নির্বাচনের আগে টোলের দুটি নতুন কক্ষও তৈরি করা হয়েছে। তাই নতুন করে টোলে সংস্কৃত ভাষা নিয়ে পড়াশোনা শুরু হবে বলে আশা করেছে জেলার শিক্ষামহল।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ১৯৩৬ সালে সরকারি অনুমোদন পায় দ্বারিকানাথ চতুষ্পাঠী। প্রথমে তিন বিঘা জমির ওপর এই টোল গড়ে ওঠে। মাধ্যমিক পাশের পরেই টোলে ভর্তি হওয়ার সুযোগ মিলত। সংস্কৃত ব্যাকরণ, সাহিত্য, স্মৃতিশাস্ত্র, ন্যায়শাস্ত্র, বেদান্ত দর্শন, বেদ ইত্যাদি ছাড়াও পৌরোহিত্য শেখানো হত। প্রতিটি বিষয়ে তিন বছরের কোর্স ছিল। অদ্য (প্রথম বর্ষ ), মধ্য (দ্বিতীয় বর্ষ) এবং তীর্থ (তৃতীয় বর্ষ)-এর শেষে পড়ুয়ারা নির্দিষ্ট বিষয়ে তীর্থপদ বা ডিগ্রি লাভ করতেন। কাব্যতীর্থ, শাস্ত্রতীর্থ ইত্যাদি উপাধিতে ভূষিত হতেন পড়ুয়ারা। হিন্দু ব্রাহ্মণ ছাড়াও অন্যরা পৌরোহিত্য নিয়ে পড়াশোনা করত। হিন্দু ও মুসলিম দুই সম্প্রদায়ের পড়ুয়ারাই এই টোল থেকে তীর্থ উপাধি লাভ করেছে। একসময় টোল পাশ করে  স্কুল, কলেজে শিক্ষকতা করেছেন অনেকে। কিন্তু বামফ্রন্ট ক্ষমতায় আসার পর থেকেই টোলের গুরুত্ব কমতে শুরু করে। সরকারি অনুদানও অনেক কমিয়ে দেওয়া হয়। কালজানি নদীর বাঁধ সহ একাধিক সরকারি প্রকল্পের জন্য দ্বারিকানাথ চতুষ্পাঠীর আয়তনও কমে যায়। ১৯৯৩ সালের বন্যায় ব্যাপক ক্ষতি হয় এই টোলের। নষ্ট হয় প্রচুর মূল্যবান বই। টোল থেকে পাশ করা পড়ুয়াদের সরকারি চাকরিতে বসা বন্ধ করে দেওয়ার পর থেকেই টোলের জনপ্রিয়তা কমতে শুরু করে। ২০০৭ সাল থেকে পরীক্ষাও বন্ধ হয়ে যায়।

- Advertisement -

বর্তমানে টোলে একজন অধ্যক্ষ রয়েছেন। তিনি সাত হাজার টাকা ডিএ পান। বাকি অন্য সব পদে কর্মী নিয়োগ বন্ধ। দীর্ঘদিন ভাঙা কাঠামোয় অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার পর চলতি বছরে নতুন করে ঘর তৈরি হয়েছে। কিন্তু পড়ুয়ার দেখা কবে মিলবে, তার কোনও নিশ্চয়তা নেই।

স্থানীয় বাসিন্দা পীযূষ ঘোষ বলেন, এই টোলে একসময় বহু পড়ুয়া পড়াশোনার জন্য আসত। কিন্তু পরীক্ষা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আর কেউ আসে না। জরাজীর্ণ চতুষ্পাঠীটি ভোটের জন্য নতুন করে তৈরি করা হয়েছে। দ্বারিকানাথ চতুষ্পাঠী (সংস্কৃত কলেজ)-র অধ্যক্ষ নিত্যানন্দ নন্দী বলেন, টোলগুলি ভারতীয় সংস্কৃতি রক্ষার পীঠস্থান। এখানে সম্প্রদায় নির্বিশেষে পড়ুয়ারা নিয়মিত বিদ্যা অর্জন করেছেন। অব্রাহ্মণরাও পৌরোহিত্যের পাঠ নিয়েছেন। জেলার একমাত্র টোলটি পুনরুজ্জীবিত হলে শিক্ষাব্যবস্থার উন্নতি হবে।

দ্বারিকানাথ চতুষ্পাঠীর পরিচালন পর্ষদের সভাপতি তথা আলিপুরদুয়ার কলেজের প্রাক্তন অধ্যাপক সুধীররঞ্জন ঘোষ বলেন, দীর্ঘদিন ধরে টোলগুলি প্রাপ্য অনুদান থেকে বঞ্চিত। সরকার টোলগুলি সংস্কার করুক। নিয়মিত পঠনপাঠনের ব্যবস্থা করা হোক। প্রাক্তন শিক্ষামন্ত্রী এ ব্যাপারে আশ্বাস দিয়েছিলেন। জেলা বিদ্যালয় পরিদর্শক (প্রাথমিক) সুজিত সরকার বলেন, টোলের শ্রেণিকক্ষ তৈরি করা হয়েছে। অধ্যক্ষ সরকারি নিয়মে ডিএ পাচ্ছেন। সরকারি যে নির্দেশিকা আসবে তা মেনে চলা হবে।