প্রকাশ মিশ্র, মালদা : স্কুলড্রেস তৈরিতেও কাটমানি নেওয়ার অভিযোগ উঠল। স্কুল পড়ুয়াদের জন্য পোশাকের ব্যবস্থা করে দেওয়ার দায়িত্ব রয়েছে কিছু সংঘ ও উপসংঘের হাতে। কিন্তু ছোটোছোটো ছেলেমেয়েদের স্কুলড্রেসের জন্যও তারা কাটমানি নিচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এদিকে বছর শেষ হতে চললেও কাটমানি নিয়ে চাপানউতোরের জেরে স্কুলড্রেস পায়নি হাজার হাজার ছাত্রছাত্রী। শিক্ষকদের একাংশ এনিয়ে দিদিকে বলোয় অভিযোগও জানিয়েছেন। এই পরিস্থিতিতে মুখ্যমন্ত্রীর দপ্তর থেকে থেকে ফোন করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। জেলা সভাধিপতি গৌরচন্দ্র মণ্ডল বলেন, এ ব্যাপারে জেলাশাসকের সঙ্গে কয়েক দফা বৈঠক হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রান্তিক মহিলাদের সশক্তিকরণের জন্য এই ভালো উদ্যোগ নিয়েছেন। অথচ কিছু মানুষের জন্য এই প্রচেষ্টা বদনাম হচ্ছে। এটা চলতে দেওয়া যাবে না। উপযুক্ত মানের পোশাক পড়ুয়াদের দিতে হবে। দ্রুত সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

বছরের শুরুতে স্কুলের জন্য স্বয়ম্ভর গোষ্ঠীর মাধ্যমে পোশাক নিতে হবে বলে আদেশনামা জারি করা হয়। আদেশনামার ওপর ভিত্তি করে বিভিন্ন স্কুল কর্তৃপক্ষ স্বয়ম্ভর গোষ্ঠীগুলিকে পোশাক কেনার ব্যাপারে আদেশ দেয়। এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার আগেই বছরের মাঝখানে অগাস্টে জেলার সমগ্র শিক্ষা অভিযান থেকে নতুন নির্দেশনামা জারি হয়। তাতে বলা হয়, পোশাক সরবরাহ করবে সংঘ বা উপসংঘ সমবায়। এই নির্দেশনার পর এই পরিস্থিতি জটিল হতে শুরু করে। জেলাজুড়ে কাটমানির অভিযোগ উঠতে থাকে। এই প্রসঙ্গে জানিয়ে রাখা ভালো যে গ্রামীণস্তরে থাকে স্বয়ম্ভর গোষ্ঠী। অঞ্চলে থাকে উপসংঘ। আর ব্লকে থাকে সংঘ। অভিযোগ ওঠে, কিছু কিছু সংঘের সদস্য নিজেরা পোশাক তৈরি করেন না। তাঁরা কাটমানির বিনিময়ে ঠিকাদার বা ফড়েদের কাছ থেকে নিম্নমানের পোশাক নিয়ে স্কুলে সরবরাহ করছেন। ঠিকাদাররা স্কুলের সঙ্গে যোগাযোগ করে বরাত নিয়ে আসেন। উপসংঘ বা সংঘকে কাটমানি দিয়ে দেন। সংঘ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সরবরাহ করে। এরপর স্কুলের তরফ থেকে পেমেন্ট করা হয়। স্কুলগুলির আপত্তি এখানেই।

স্কুল কর্তপক্ষের অভিযোগ, ভালোমানের পোশাক থাকে না। তাই টাকার দায়ভার তাঁরা নিতে রাজি নন। স্কুলগুলির দাবি, বরাদ্দ করা টাকা সরাসরি পাঠানো হোক সংঘ বা উপসংঘের অ্যাকাউন্টে। সংঘ কোনো কাজ না করেই মোটা অঙ্কের টাকা পেয়ে যায়। যার ভাগ প্রশাসনের বিভিন্ন অংশে তাদের দিতে হয়। একথা নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কিছু সংঘের সদস্যই স্বীকার করেছেন। একটি অঞ্চলে প্রাথমিক ও হাইস্কুল, মাদ্রাসা মিলিয়ে কয়েক হাজার ছাত্রছাত্রী থাকে। একশো টাকা কাটমানি হলে টাকার অঙ্কটা নেহাত কম নয়। রাজ্য সরকার একটা ভালো উদ্যোগ নিয়ে মহিলাদের সশক্তিকরণের য়ে উদ্যোগ নিয়েছে, তা নীচুতলায় পৌঁছছে না। স্বয়ম্ভর গোষ্ঠীর প্রান্তিক সদস্যরা আর্থিক সশক্তিকরণ থেকে বঞ্চিতই থেকে যাচ্ছেন। এই অভিযোগে সম্প্রতি জেলা প্রশাসনের অনুষ্ঠানে সরব হয়েছিলেন বেশ কয়েকটি স্বয়ম্ভর গোষ্ঠীর মহিলারা।

বছর গড়িয়ে গেলেও এই চাপানউতোরের জেরে পোশাক না পাওয়ায় সরব হয়েছেন বহু শিক্ষক সংগঠন। মাধ্যমিক শিক্ষকদের সংগঠনের জেলা নেতা সুনন্দ মজুমদার এবং শাসকদলের প্রাথমিক শিক্ষক সংগঠনের মানিকচক এক নম্বর চক্রের সম্পাদক হেনসার আলি পোশাক না পাওয়ার অভিযোগ তুলেছেন। এই ঘটনায় আধিকারিকদের একাংশ যুক্ত রয়েছেন বলে অভিযোগ তুলেছেন তাঁরা। খোদ বিডিও অফিসের নাম জড়িয়েছে। অভিযোগের কথা ফোন এবং ইমেইল বার্তায় মুখ্যমন্ত্রীর দিদিকে বলোয় জানানো হয়েছে। সুনন্দবাবু জানান, অভিযোগ পাওয়ার পরে মুখ্যমন্ত্রীর দপ্তর থেকে দফায় দফায় ফোন করে বিস্তারিত খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে। তাঁরা দ্রুত ব্যবস্থা নেবেন বলেও আশ্বাস দিয়েছেন। যদিও তাঁর দপ্তরের জড়িত থাকার কোনো অভিযোগ পাননি বলে জানিয়েছেন মানিকচকের বিডিও সুরজিৎ পণ্ডিত।

মাস দুয়েক আগে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে টাউন হলে জনতার দরবার আয়োজিত হচ্ছিল। পরপর তিন সপ্তাহে এই অনুষ্ঠান হয়। সেখানে মানিকচক, কালিয়াচক, গাজোল, পুরাতন মালদা প্রভৃতি ব্লকের স্বয়ম্ভর গোষ্ঠীর মহিলারা অংশ নিয়েছিলেন। জেলা প্রশাসনের আধিকারিকদের কাছে পোশাক নিয়ে কাটমানির ব্যাপারে সরাসরি অভিযোগ করেছিলেন। তাঁদের অভিযোগ ছিল, এর আগে তাঁরা পোশাক নির্মাণের দায়িত্ব পেতেন। সরবরাহের দায়িত্ব পেতেন। সেই দায়িত্ব তাঁদের হাত থেকে ছিনিয়ে নিয়ে সংঘ বা উপসংঘকে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সংঘ বা উপসংঘ ফড়েদের দিয়ে কাটমানি নিয়ে এই পোশাক সরবরাহ করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। তৎকালীন জেলাশাসক এ ব্যাপারে উদ্যোগ নেওয়ার আশ্বাস দিলেও কাজের কাজ কিছুই হয়নিl

শিক্ষামন্ত্রী, সর্বশিক্ষা অভিযানের মাসিক রাজ্য প্রকল্প অধিকর্তা, জেলাশাসক এবং সংশ্লিষ্ট আধিকারিকদের লিখিত অভিযোগে এই সমস্যার কথা জানিয়েছিলেন মানিকচকের শিক্ষক মানবেন্দ্র মণ্ডল। তাঁদের বক্তব্য, গত ফেব্রুয়ারি মাসে পশ্চিমবঙ্গ সর্বশিক্ষা মিশনের এক আদেশনামায় (মেমো নম্বর ২০৫) স্বয়ম্ভর গোষ্ঠী থেকে পোশাক কেনার জন্য বলা হয়। ৬০০ টাকায় দুই সেট করে পোশাক কিনতে বলা হয়। পরে ১৬-০৮-২০১৯ সালে জেলার সর্বশিক্ষা মিশন থেকে এক চিঠিতে (মেমো ২০৯) বলা হয়, সংঘ বা উপসংঘকে সমবায়ে মাধ্যমে পোশাক কিনতে হবে। রাজ্যের সর্বত্র এই নির্দেশ জারি না হলেও মালদা সহ কয়েকটি জেলা পৃথকভাবে এই নির্দেশনা জারি করে। ফলে স্কুলগুলি কোন আদেশ মানবে, তা নিয়ে তীব্র টানাপোড়েন শুরু হয়।

তাঁরা জানিয়েছেন, ইতিমধ্যে বহু স্কুল আগের নির্দেশ অনুয়াযী এলাকার স্বয়ম্ভর গোষ্ঠীকে একজোড়া পোশাক কেনার নির্দেশ দিয়েছেন। তাদের ক্ষেত্রে কি হবে? প্রশাসনের কোনো কোনো আধিকারিক গোপন আঁতাতের বিনিময় সংঘকে পোশাক কেনার অর্ডার দিতে লাগাতার চাপ দিয়ে যাচ্ছেন। পুরাতন মালদা ও হবিবপুরের কয়েকজন শিক্ষক অভিযোগ করেছেন, স্কুলের অ্যাকাউন্টে যখন পোশাক কেনার টাকা দেওয়া হচ্ছে, তখন স্কুলের দায়িত্ব বর্তেছে ছাত্রছাত্রীদের ভালো পোশাক দেওয়ার জন্য। অথচ সংঘ যে পোশাক সরবরাহ করছে, তা খুব নিম্নমানের। এই ক্ষেত্রে সংঘের অ্যাকাউন্টে রাজ্য সরকার টাকা দিয়ে দিক। তাতে স্কুলের কোনো আপত্তি নেই। কিন্তু নিম্নমানের পোশাকের দায়িত্ব স্কুলগুলি কেন নেবে।