ক্রিকেট মাঠে পরীক্ষা, জানা নেই রায়গঞ্জ বিশ্ববিদ্যালয়ের

139

দীপঙ্কর মিত্র, রায়গঞ্জ : কোভিড পরিস্থিতির কারণে এখনও কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলি না খোলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। অথচ রায়গঞ্জ বিশ্ববিদ্যালয়ে খেলার মাঠে বসে পরীক্ষা দিচ্ছেন স্নাতকোত্তরস্তরের পড়ুয়ারা। আর কেউ সেটা জানেই না। কেউ দিচ্ছেন সংস্কৃত পরীক্ষা। কেউ বাংলা পরীক্ষা দিচ্ছেন। কেউ দিচ্ছেন ল পরীক্ষা। কেউ এসেছেন হেমতাবাদ থেকে। কেউ আবার ভিনজেলা থেকে। আবার সেই মাঠেই ছেলেরা ছুটির আমেজে ক্রিকেট খেলছে। অথচ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানেই না পড়ুয়ারা বিশ্ববিদ্যালয়ের খেলার মাঠে পরীক্ষা দিচ্ছেন। বৃহস্পতিবার দুপুরে এই দৃশ্যই দেখা গেল রায়গঞ্জ বিশ্ববিদ্যালয়ে মাঠে।

পরীক্ষার্থীরা জানান, এদিন সকাল ১১টায় অনলাইনে প্রশ্ন পাওয়ার পর তাঁরা বিশ্ববিদ্যালয়ে মাঠে এসে পরীক্ষা দিতে শুরু করেন। বেলা ২টো পর্যন্ত তাঁরা পরীক্ষা দেবেন বলে জানান। পরীক্ষার্থীদের অনেকেই উত্তরবঙ্গ সংবাদের বুম ও ক্যামেরা দেখে মুখ লুকোতে ব্যস্ত হযে পড়েন। শেষ পর্যন্ত বিষযটি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের নজরে আসতে নিরাপত্তাকর্মীরা পরীক্ষার্থীদের মাঠ থেকে সরিয়ে দেন। রায়গঞ্জ বিশ্ববিদ্যালয়ে রেজিস্ট্রার দুর্লভ সরকার বলেন, এই পরীক্ষাটি ইউজিসির নিয়ম অনুসারে অনলাইনে হচ্ছে। এ ব্যাপারে ছাত্রছাত্রীদের পরিষ্কারভাবে নির্দেশ দেওযা আছে। তাঁদের একবারও বিশ্ববিদ্যালয়ের মাঠে এসে পরীক্ষা দেওযার কথা বলা হযনি। এখনই পরীক্ষা নিয়ামকের সঙ্গে যোগাযোগ করে তাঁদের সরিযে দেওয়া হবে। তিনি বলেন, কোভিড পরিস্থিতি এখনও স্বাভাবিক হয়নি। তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে এসে কেউ পরীক্ষা দিতে পারবেন না। নেটওয়ার্কের কোনও সমস্যা থাকলে আমাদের জানালে আমরা ব্যবস্থা নেব। শিক্ষকদের দিয়ে এ ব্যাপারে বোঝানো হবে।

- Advertisement -

রায়গঞ্জ বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার বিভাগের অফিস সুপারিন্টেন্ডেন্ট তপন নাগ বলেন, এটা তো খেলার মাঠ। এখানে আশেপাশের ছেলেরা খেলাধুলো করে। এটা অনলাইনে পরীক্ষা দেওযার জায়গা নয। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে কিছুই জানে না। কারণ খেলার মাঠে প্রায়ই দেখা যায় ছাত্রছাত্রীরা এসে গল্প করে। আমরাও করেছি। কেউ বিশ্ববিদ্যালয়কে না জানালে কীভাবে জানব? এভাবে তো ছাত্রছাত্রীদের পরীক্ষা দেওযার কথা নয়। রায়গঞ্জ বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক সঞ্জীব মণ্ডল বলেন, পরীক্ষা তো অনলাইন মোডে চলছে। বাড়িতেই পরীক্ষা দেওয়ার কথা। বিশ্ববিদ্যালয়ে মাঠে এসে পরীক্ষা দেওয়ার কারণ বুঝতে পারছি না। নেট পরিষেবা নিয়ে  টেকনিকাল কোনও সমস্যা থাকলে তাঁরা বিশ্ববিদ্যালয়কে জানাতে পারতেন। এর আগে এমন অভিযোগ আসেনি। পড়ুয়াদের দাবি, বাড়িতে নেট সংযোগ না পাওযায তাঁরা বিশ্ববিদ্যালয়ে মাঠে এসে পরীক্ষা দিচ্ছেন। এর আগে তাঁরা কখনও বন্ধুর বাড়িতে, আবার কখনও মেসে গিয়ে পরীক্ষা দিয়েছেন। তাঁদের বক্তব্য, শহরে এসে একসঙ্গে পরীক্ষা দিলে অনেক সুবিধে।

হেমতাবাদ ব্লক থেকে পরীক্ষা দিতে এসেছেন রতন রায। মাঠে পরীক্ষা দিতে দিতে তিনি বলেন, আমি এমএ সেকেন্ড সিমেস্টারের বাংলা পরীক্ষা দিচ্ছি। বাড়িতে নেটের সংযোগ পাওযা যায় না। তাই মাঠে এসে পরীক্ষা দিচ্ছি। তিনি বলেন, সবাই মিলে পরীক্ষা দেওয়ায় প্রশ্নগুলি বুঝতে সুবিধা হচ্ছে। এর আগে মেসে গিয়ে পরীক্ষা দিয়েছি। ইটাহার থেকে এসেছেন পঙ্কজ বর্মন। তিনি বলেন, আমাদের বাড়ি অজগ্রামে। তাই মোবাইলের টাওয়ার পাওযা যায না। পরীক্ষা দেওয়ার পর উত্তরপত্র পাঠাতেও সমস্যা হয়। এখান থেকে পরীক্ষা দিলে নেটে সহজে উত্তরপত্র পাঠানো যায়। তাই বন্ধুরা মিলে বিশ্ববিদ্যালয়ের মাঠে এসে পরীক্ষা দিচ্ছি। কুশমণ্ডি থেকে পরীক্ষা দিতে এসেছেন আবদুল মালেক। তিনি আইন বিভাগের ছাত্র। তবে ক্যামেরার সামনে কিছু বলতে চাননি। বেশ কয়েকজন ছাত্রছাত্রীকে দেখা গেল বইয়ের পাতার ফটোকপি দেখে উত্তর লিখছেন। টুম্পা রায় নামে এক পরীক্ষার্থী বলেন, মাঠে ক্রিকেট খেলা চললেও আমাদের পরীক্ষা দিতে কোনও সমস্যা হচ্ছে না।

বিশ্ববিদ্যালয়ের মাঠে ক্রিকেট খেলছিল দেবজ্যোতি সাহা। দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্র দেবজ্যোতি বলে, আমরা তো এখানে রোজই ক্রিকেট খেলি। প্রায়দিনই দেখি অনেকে মাঠে বসে লেখালেখি করেন। তাঁরা যে এমএ ক্লাসের পরীক্ষা দিচ্ছেন তা তো আমরা জানি না। আমাদের কিছু বলেনও না। তাই আমরা আমাদের মতো খেলাধুলো করি। স্থানীয় বাসিন্দা তথা গৃহশিক্ষক মসিয়ুর রহমান বলেন, মাঠের পাশ দিয়ে যাতায়াত করতে গিয়ে প্রায়ই দেখি কিছু ছাত্র ছাত্রী জটলা করে লেখালেখি করছে। তারা যে আড্ডার ছলে এমএ পরীক্ষা দিচ্ছে কোনওদিন ধারণাই হয়নি। এভাবে স্বাস্থ্যবিধি অমান্য করে মাস্ক না পরে মাঠে বসে পরীক্ষা দিচ্ছে, বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের আগেই লক্ষ করা উচিত ছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ে মাঠে কর্মরত বেসরকারি সংস্থার এক কর্মী বলেন, প্রায়দিনই দেখি মাঠের এখানে সেখানে বই দেখে কিছু ছাত্রছাত্রী খাতায় লিখছে। তারা যে পরীক্ষা দেয় এতদিন বুঝতেই পারিনি।