গৌরহরি দাস, কোচবিহার : কর্মীসংকটে ধুঁকছে কোচবিহারের রাজ আমলের ঐতিহ্যবাহী জগদ্দীপেন্দ্র (জেডি) হাসপাতাল। মহারাজার নামাঙ্কিত কোচবিহার শহর সংলগ্ন হাসপাতালটিতে কর্মী সমস্যা এমনই যে চতুর্থ শ্রেণির কর্মী হাসপাতালের স্টোরকিপারের দায়িত্ব সামলাচ্ছেন। একইসঙ্গে হাসপাতালের নার্স, ডাক্তার, গ্রুপ-ডি সর্বত্রই প্রযোজনের তুলনায় অনেক কম কর্মী রয়েছেন। তবে, শুধু কর্মী সমস্যা নয়, দীর্ঘদিন ধরে সংস্কার না হওয়ায় হাসপাতালের স্টাফ কোয়ার্টার, লেপ্রোসি ঘর ঝোপজঙ্গলে ঢেকে পরিত্যক্ত পড়ে রয়েছে। হাসপাতাল ভবনের পুরোটাই প্রায় বেহাল হয়ে পড়েছে। হাসপাতালের বেহাল অবস্থার কথা জেলা স্বাস্থ্য দপ্তর থেকে শুরু করে নবান্ন পর্যন্ত সকলের জানা থাকলেও কেউ কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।

কোচবিহার শহর সংলগ্ন খাগড়াবাড়ি চৌপথি থেকে এক কিলোমিটারের মধ্যেই ৩১ নম্বর জাতীয় সড়কের পাশে জেডি হাসপাতাল। ১৯৪৭ সালে কোচবিহারের রাজ আমলে তৈরি হয় হাসপাতালটি। ২৫ একরেরও বেশি জায়গা নিয়ে থাকা হাসপাতালটি লোকের কাছে টিবি হাসপাতাল নামেই পরিচিত। বিশাল এলাকাজুড়ে অবস্থিত এই হাসপাতালের জমিতেই কোচবিহারে প্রাথমিকভাবে মেডিকেল কলেজ করার পরিকল্পনা নিয়েছিল রাজ্য সরকার। সেইমতো রাজ্য সরকারের প্রতিনিধিরা এবং উত্তরবঙ্গ উন্নয়নমন্ত্রী রবীন্দ্রনাথ ঘোষ এক-দেড়বছর আগে হাসপাতালের জমিও পরিদর্শন করেছিলেন। কিন্তু শেষপর্যন্ত মেডিকেল কলেজ এখানে তৈরি হয়নি।

হাসপাতালটির বিশাল এলাকায় কোনো সীমানাপ্রাচীর নেই। গোরু, কুকুর, শুয়োর অবাধে ঘোরাঘুরি করছে হাসপাতাল চত্বরে। হাসপাতালের প্রবেশপথ থেকে শুরু করে হাসপাতালের চতুর্দিকে রাস্তাঘাট ভেঙেচুরে একেবারে বেহাল হয়ে পড়েছে। হাসপাতালের ভিতর আগাছা-জঙ্গলে ভরে রয়েছে। সংস্কারের অভাবে জঙ্গলে ভরে যাওয়ায় হাসপাতালের গ্রুপ-ডি স্টাফদের থাকার কোয়ার্টার ও কুষ্ঠ চিকিত্সার জন্য তৈরি করা ভবন অনেকদিন আগেই পরিত্যক্ত ঘোষণা করেছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।

তবে, ভবন ও রাস্তাঘাটের বেহাল অবস্থার থেকেও ভয়াবহ হাসপাতালের কর্মীসমস্যা। হাসপাতাল সূত্রে জানা গিয়েছে হাসপাতালটিতে ১২০টি শয্যা রয়েছে। সাধারণত ৪০-৫০ জন রোগী সেখানে ভরতি থাকেন। ভরতি থাকা প্রায় সমস্ত রোগীই টিবি অথবা ডায়ারিয়ায় আক্রান্ত। এছাড়া হাসপাতালের আউটডোরেও গড়ে প্রতিদিন ৩৫০-৪০০ রোগী চিকিত্সা করাতে আসেন। হাসপাতাল সূত্রে জানা গিয়েছে বর্তমানে হাসপাতালটিতে গ্রুপ-ডির ৪২টি পদের মধ্যে রয়েছেন মাত্র ১০ জন কর্মী। সুইপারের পদ ১২টি থাকলেও রয়েছেন মাত্র চারজন। হাসপাতালে ২৮ জন নার্সের পদ থাকলেও রয়েছেন মাত্র ১০ জন। এছাড়া ডাক্তার ছয়জনের মধ্যে রয়েছেন তিনজন। ওয়ার্ড মাস্টারের দুটি পদ থাকলেও সেখানে একজনও নেই। হাসপাতালের সুপার ডঃ এ কে বালা বলেন, কর্মীর সমস্যা রয়েছে। ওয়ার্ড মাস্টারের দুটি পদ থাকলেও সেখানে একজনও নেই। বাধ্য হয়ে আমরা একজন গ্রুপ-ডি কর্মীকে দিয়ে ওয়ার্ড মাস্টারের কাজ চালাচ্ছি। সংস্কার না হওয়ার ফলে ভবনগুলি বেহাল হয়ে পড়েছে। সুপার বলেন, অল্প কয়েজন ডাক্তার ও কর্মী দিয়ে যতটা সম্ভব রোগীদের পরিসেবা দেওয়ার চেষ্টা করছি। হাসপাতালে কয়েকজন কর্মী দেওয়া হলে খুব উপকার হয়। প্রশ্ন উঠেছে, মহারাজার নামে তৈরি ঐতিহ্যবাহী হাসপাতালটিকে কেন এভাবে নষ্ট করা হচ্ছে? কেন হাসপাতালটির সংস্কার করা হচ্ছে না? জেলার নেতা-মন্ত্রীরা রাজ্য সরকারের উন্নয়নের ফিরিস্তির বন্যা বইয়ে দিলেও কেন তাঁরা এই হাসপাতালটির সংস্কারের কথা বলেন না ? হাসপাতালের এমন বেহাল অবস্থা নিয়ে ক্ষোভ বাড়ছে সাধারণ মানুষের মধ্যে।