পুজোর আগে ১০৮ পদ্মের খোঁজে সুবলরা

সৌরভকুমার মিশ্র, হরিশ্চন্দ্রপুর : কথিত রয়েছে দেবী দুর্গাকে সন্তুষ্ট করতে ত্রেতাযুগে শ্রীরামচন্দ্র ১০৮ টি নীলপদ্ম দিয়ে পুজো করার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু একটি ফুল কম পড়ায় তিনি নিজের চোখ উপড়ে তা দেবীর চরণে উৎসর্গ করতে উদ্যত হলে তাঁকে নিবৃত্ত করেন দেবী দুর্গা। সেই প্রথা মেনে এখনও দুর্গাপুজোর সন্ধিপুজোতে ১০৮টি পদ্মফুল ব্যবহার করা হয়। আর মাত্র মাসখানেক পরেই বাঙালির সেরা শারদীয়া দুর্গোৎসব। হরিশ্চন্দ্রপুর থানা এলাকার বিভিন্ন পুজোমণ্ডপে, বনেদি বাড়ির দুর্গাপুজোর সময় এই পদ্ম ফুল সরবরাহ করেন এলাকার সুবল দাস, দীপক দাস, কমলা দাসের মতো কিছু মানুষেরা। প্রতি বছর দুর্গাপুজোর সময় পদ্ম বিক্রি করে কিছু বাড়তি রোজগার হয়। এই বাড়তি রোজগারের এদের পরিবারের মুখে বাড়তি আনন্দের হাসি ফুটিয়ে তোলে।

কিন্তু এবছর করোনা সংক্রমণ ও লকডাউনের জেরে পুজোর আনন্দের সংজ্ঞাটাই যেন পালটে গিয়েছে। কথাপ্রসঙ্গে সুবলবাবু বলেন, সারা বছরই দুর্গাপুজোর আশায় বসে থাকি। ওইসময় এলাকার বিভিন্ন পুজোমণ্ডপে এবং কিছু জমিদারবাড়িতে আমি পদ্মফুল দিয়ে আসি। ১০৮টি নীলপদ্ম সন্ধিপুজোর অপরিহার্য অঙ্গ। দুর্গাপুজোর একমাস আগে থেকেই বিভিন্ন বাড়িতে ঘুরে অর্ডার নিই। এই সময় পদ্মপিছু ২৫ থেকে ৩৫ টাকা পর্যন্ত পেয়ে যাই। কিন্তু এবছরটা ব্যতিক্রম। এখনও পর্যন্ত আশানুরূপ কোনও অর্ডার পাইনি। বৃদ্ধ বয়সে অন্য কিছু কাজ করতে পারি না। বছরের অন্য সময়ে চেয়ে চিনতে দিনযাপন করতে হয়। পুজো ক্রমেই এগিয়ে আসছে। জানি না এবার কেমন অর্ডার পাব। মনে হচ্ছে না প্রতিবারের মতো রোজগার হবে।

- Advertisement -

আরেক পদ্ম বিক্রেতা কমলা দাস বলেন, হরিশ্চন্দ্রপুর থানা এলাকায় এই নীলপদ্ম পাওয়া যায় না। আমি পার্শ্ববর্তী বিহারের আজিমনগর, খুরিয়াল, মুকুরিয়া প্রভৃতি এলাকায় পুজোর আগে চলে যাই। ওখানে বিভিন্ন গ্রামের পুকুরে এই ধরনের পদ্ম পাওয়া যায়। সেখানে পুকুরের মালিক আমাদের সেই পদ্ম বিক্রি করেন। সেই পদ্ম হরিশ্চন্দ্রপুরের বিভিন্ন পুজো কমিটিতে সরবরাহ করি। আমাদের ফুল সংরক্ষণ করার কোনও উপায় নেই। আর আমাদের অত পুঁজিও নেই যে ফ্রিজার মেশিন কিনে ফুল সংরক্ষণ করব। বছরের এই সময়টায় কিছু বাড়তি রোজগারের আশায় পদ্ম বিক্রি করি। বছরের বাকি সময়টা দিনমজুরি করে সংসার চালাতে হয়। কিন্তু এবার করোনা সংক্রমণের জেরে ভিনরাজ্যে যাওয়াটা খুব কঠিন হয়ে পড়েছে। জানি না এবার পদ্ম বিক্রি করতে পারব কি না। কুশিদা এলাকার এক পদ্ম বিক্রেতা দীপক দাস বলেন, প্রতি বছরের মতো পদ্ম বিক্রি করে এবার আশানুরূপ দাম পাওয়া যাবে না। আমরা বাইরের রাজ্য থেকে পদ্ম নিয়ে আসি। কিন্তু যাওয়া আসার খরচ মিলিয়ে কিছু লাভ রেখে সেই পদ্মের দাম উঠবে কি না সে নিয়ে প্রশ্ন আছে।

বাংলা-বিহার সীমান্তবর্তী আমদাবাদ গ্রামের এক পদ্মচাষি প্রকাশ মণ্ডল বলেন, আমরা পুজোর আগে দুর্গাপুজোর জন্য নীলপদ্ম চাষ করি। এলাকার বেশ কয়েকটি পুকুর লিজ নিয়ে এই চাষ করা হয়। বিহার ছাড়াও বাংলার বিভিন্ন প্রান্তে আমাদের এখান থেকে ফুল যায়। কিন্তু এবছর করোনার জন্য অনেক বিক্রেতাই এখনও ফুল নিতে আসেননি। এবছর চাষের খরচ উঠবে কি না সে বিষয়ে সন্দেহ রয়েছে। হরিশ্চন্দ্রপুর এলাকার এক বনেদি বাড়ির সদস্য শুদ্ধসত্ত্ব মিশ্র বলেন, দুর্গাপুজোয় পদ্ম এক অপরিহার্য উপকরণ। প্রতিবছর এলাকার কিছু পদ্ম বিক্রেতা বাড়িতে এসে এই পদ্মফুল পৌঁছে দিয়ে যান। এরা নিতান্তই গরিব। বছরের এই সময়টায় পদ্ম বিক্রি করে বাড়তি রোজগার করে। কিন্তু এবার পরিস্থিতির জেরে মনে হচ্ছে না, এরা পদ্ম দিতে পারবে। তাই আমাদের বাধ্য হয়ে চড়া দাম দিয়ে শহর থেকেই পদ্ম সংগ্রহ করতে হতে পারে।