তৃণমূল ছাড়তে পারেন শুভেন্দু অধিকারী, ফিরতে পারেন শোভন

4233

পুলকেশ ঘোষ, কলকাতা: লাগাতার ডানা ছাঁটা চলছে শুভেন্দু অধিকারীর। তিনিও দলের কর্মসূচিতে উপস্থিতি ক্রমশ কমিয়ে দিচ্ছেন। পরিবহণমন্ত্রীকে নিয়ে তাই জল্পনার শেষ নেই। নন্দীগ্রামের আন্দোলন থেকে উঠে আসা এই তরুণ তুর্কি দল ছাড়তে পারেন ধরে নিয়ে পালটা ঘুঁটি সাজাচ্ছেন তৃণমূল নেতৃত্ব। অন্যদিকে, আবার আলোচনার কেন্দ্রে তৃণমূলত্যাগী শোভন চট্টোপাধ্যায়। তাঁর স্ত্রী রত্না চট্টোপাধ্যায়ের সাংগঠনিক দায়িত্ব কেড়ে নেওয়া হয়েছে বলে তৃণমূলের তরফে ভাসিয়ে দেওয়ায় আলোচনা শুরু হয়েছে যে, কলকাতার প্রাক্তন মেয়রের তৃণমূলে ফেরার পথ প্রশস্ত করতেই এই পদক্ষেপ করা হল। কেননা দলে ফেরার ব্যাপারে শোভনের প্রথম শর্তই হল, রত্নাকে দায়িত্ব থেকে অপসারণ। গত কয়েক মাসে শুভেন্দুবাবুর রাজনৈতিক জীবনের জৌলুস অনেকখানি কমেছে। নন্দীগ্রাম আন্দোলনের এই প্রথমসারির নেতা রাজ্যে তৃণমূল ক্ষমতাসীন হওয়ার পর যে গুরুত্ব পেতেন তা এখন অনেকটা স্তিমিত। একের পর এক সাংগঠনিক পদ থেকে তাঁকে এবং তাঁর প্রিয়জনদের ছেঁটে ফেলা চলছে।

ভোট কৌশলী প্রশান্ত কিশোরের পরামর্শে সম্প্রতি মমতা ব্লক পর্যায় পর্যন্ত তৃণমূলের কমিটি যেভাবে ঢেলে সাজালেন তাতে শুভেন্দুর গুরুত্ব আদৌ বাড়ল না। বরং কমে গেল। তাঁর জেলায় তাঁরই অনুগামীকে যুব সভাপতির পদ থেকে বাদ দেওয়া হল। এরপর নতুন তৈরি রাজ্য কমিটির প্রথম বৈঠকে শুভেন্দু গরহাজির থাকলেন। রাজ্য মন্ত্রীসভার বৈঠকেও তাঁকে দেখা গেল না। ঝাড়গ্রামে আদিবাসী দিবসের অনুষ্ঠানেও হাজির হননি তিনি। এরপর নীরবে তাঁকে সরিয়ে দেওয়া হল রাজ্য সরকারি ফেডারেশনের মেন্টর পদ থেকে। কমিটি বদলের সেই বৈঠকে দলের রাজ্য সভাপতি সুব্রত বকসি ও মহাসচিব পার্থ চট্টোপাধ্যায় তৃণমূল ভবনে কর্মচারী ফেডারেশনের নেতাদের সঙ্গে নিয়ে বসেছিলেন। সেখানে তৃণমূল নেত্রী ফোনে ভাষণ দেন। কিন্তু তখনও মেন্টর পদে থাকলেও হাজির ছিলেন না শুভেন্দু। শুধু এই দু’তিনটি ঘটনা নয়, গত কয়েক মাসে শুভেন্দুবাবুকে সক্রিয় দলীয় কর্মসূচি থেকে ক্রমশ সরিয়ে নিতে দেখা যাচ্ছে। এর মধ্যে তাঁর অনুগামীদের অতিসক্রিয় হতে দেখা যাচ্ছে। শুভেন্দুঘনিষ্ঠরা রাজ্যজুড়ে পোস্টার ও হোর্ডিংয়ে তাঁর ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করার প্রয়াসে নেমেছেন। নানাভাবে ক্ষোভপ্রকাশ করে তাঁরা মন্তব্য করছেন যে, শুভেন্দুবাবুকে তাঁর প্রাপ্য জায়গা দেননি তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।

- Advertisement -

একদিকে শুভেন্দুর দলীয় কর্মসূচি থেকে সরে থাকা, অন্যদিকে তাঁর অনুগামীদের এই ধরনের পদক্ষেপে পরিবহণমন্ত্রীর বিজেপিতে যোগ দেওয়ার জল্পনা ক্রমশ বাড়ছে। যদিও তাঁর আলাদা দল গঠনের সম্ভাবনা আছে বলেও কেউ কেউ মনে করছেন। সেজন্যই অনুগামীদের দিয়ে রাজ্যজুড়ে পৃথক শক্তি বিকশিত করার চেষ্টা করছেন বলে মনে করা হচ্ছে। একসময় মমতা বলেছিলেন, অভিষেক-শুভেন্দু আগামী প্রজন্মের নেতা। নাম দুটি পাশাপাশি উচ্চারণ করলেও সমগুরুত্ব কখনোই দেননি তৃণমূল নেত্রী। তবে জননেতা ইমেজের জন্য শুভেন্দুকে জঙ্গলমহল, মালদা, মুর্শিদাবাদ, উত্তর দিনাজপুর, সর্বত্রই ক্রাইসিস ম্যানেজার করে পাঠিয়েছেন মমতা। কিন্তু তাঁর ডানা ছাঁটা শুরু হতেই রাজ্যের বিভিন্ন জায়গায় বেশ কিছু হোর্ডিং ও পোস্টারে শুভেন্দুকে কোথাও ‘বাংলার মুক্তিসূর্য’ কোথাও সংগ্রামের অপর নাম বা উন্নয়নের কান্ডারি ইত্যাদি নানা বিশেষণে ভূষিত করতে দেখা যাচ্ছে। পোস্টার বা হোর্ডিংগুলিতে তৃণমূলের নাম বা প্রতীক কিন্তু নেই। নেই মমতার ছবিও। হোর্ডিং ও পোস্টারগুলির সৌজন্যে রয়েছে তৃণমূলের নানা পদাধিকারীর নাম।

তৃণমূল নেত্রীর বদলে দলের একাংশ শুভেন্দুর ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করতে মাঠে নামায় অশনিসংকেত দেখছেন দলীয় নেতৃত্ব। যদিও শুভেন্দুর বাবা তথা দলের সাংসদ শিশির অধিকারী সাফাই দিয়ে বলেন, অধিকারী পরিবার বেইমান নয়। শুভেন্দুকে নিয়ে অপপ্রচার হচ্ছে। আমরা মমতার নির্দেশ মেনেই কাজ করছি। তাঁর বক্তব্য, শুভেন্দু দলেরই লোক। দলের যে নেতারা এসব করছেন, তাঁদের রাজনৈতিক ছাড়া অন্য পরিচয় আছে। শুভেন্দুকে ভালোবেসেই তাঁরা এসব করছেন। এতে অসুবিধার কী আছে? এই পরিস্থিতিতে শুভেন্দুর বিজেপিতে যাওয়া নিয়ে বাতাসে জল্পনা ভাসছে। বিজেপির একাংশ সেই প্রচারে হাওয়াও দিচ্ছেন। তবে শুভেন্দুর কাছে বিজেপি কতটা স্বস্তির জায়গা হবে তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে চর্চা আছে। তৃণমূলে ভাঙন ধরাতে মরিয়া বটে বিজেপি, কিন্তু কষ্টিপাথরে যাচাই করে তবেই দলের কাজে লাগাতে চায় সংঘপন্থীরা। শুভেন্দু বিবেকানন্দ ভক্ত হলেও তাঁর একেবারে স্বচ্ছ ইমেজ নেই। সারদা ও নারদ মামলার কালি লেগেছে তাঁর সাদা পাজামা-পাঞ্জাবিতে। নারদ মামলায় ইডি সর্বশেষ তৃণমূলের যে নেতা-নেত্রীদের নোটিশ পাঠিয়েছে, তাঁদের মধ্যে শুভেন্দুর নাম রয়েছে।

জননেতা হিসেবে মমতাকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করার কিছুটা ক্ষমতা থাকলেও বিজেপি শুভেন্দুকে প্রোজেক্ট করবে বলে কেউ আশাবাদী নয়। সেজন্যই ভাসছে দ্বিতীয় সম্ভাবনার জল্পনা। অনেকেই মনে করছেন, যেভাবে মমতা কংগ্রেস থেকে বেরিয়ে তৃণমূল কংগ্রেসের জন্ম দিয়েছিলেন, সেভাবেই আলাদা দল গড়ার পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছেন শুভেন্দু। কংগ্রেস ও তৃণমূলের অনেকে সেখানে যোগ দিয়ে তৈরি করতে পারেন তৃতীয় কোনও শক্তি। যে শক্তি বাকি দু’পক্ষের সঙ্গে ভোট রাজনীতির দরাদরিতে যেতে পারবে। এজন্যই শুভেন্দুর ভাবমূর্তি প্রচারে পোস্টার ও হোর্ডিং লাগানো চলছে। তবে রাজনৈতিক মহলের মতে, শুভেন্দুর পক্ষে এই পথ কুসুমাস্তীর্ণ নয়। সেক্ষেত্রে একদিকে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা তাঁর ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে, অন্যদিকে নবান্নের অঙ্গুলিহেলনে রাজ্য পুলিশ খুলতে পারে পুরোনো মামলার ফাইল। ফলে দু’দিকের চাপ সামলানো তাঁর পক্ষে সহজ হবে না।

শোভন চট্টোপাধ্যায়কে ঘিরেও দরকষাকষি এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে। দীর্ঘদিন নিষ্ক্রিয় থাকলেও শোভনকে আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনের আগে বিজেপি অথবা তৃণমূলের মঞ্চ বেছে নিতেই হবে। নইলে রাজনৈতিক অবসর ছাড়া গতি নেই। শোভন ফিরলে তাঁর এই ঘর ওয়াপসি তৃণমূলকে অবশ্যই কিছুটা মাইলেজ দেবে। প্রাথমিকভাবে শোভনের সঙ্গে তৃণমূলের কথা অনেকটা এগিয়েছিল। কিন্তু শোভনের স্ত্রী রত্না চট্টোপাধ্যায়কে ১৩১ নম্বর ওয়ার্ডের সাংগঠনিক দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়ার কথা সুব্রত বকসি ঘোষণা না করে কৌশলে সংবাদমাধ্যমে পৌঁছে দেওয়ায় শোভন ও তাঁর বান্ধবী বিষয়টি নিয়ে সন্দিহান হয়ে পড়েছেন বলে জানা গিয়েছে। শোভন আগেই তৃণমূল নেতৃত্বকে জানিয়েছিলেন, রত্না দলের কোনও দায়িত্বে থাকলে তিনি ফিরবেন না। তাই তিনি এ ব্যাপারে গ্যারান্টি চান। বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের তরফে শোভনকে সক্রিয় করার চেষ্টাও আবার শুরু হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে দলের অন্যতম ভারপ্রাপ্ত নেতা অরবিন্দ মেনন মাত্র একদিন আগে শোভনের সঙ্গে দেখা করেছেন। কিন্তু শোভনের জট দিলীপ ঘোষকে নিয়ে তিনি বুঝে গিয়েছেন, রাজ্য সভাপতি তাঁকে তেমন আমল দেন না। বিজেপির তরফে তাঁকে কোনও ভবিষ্যৎ প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হচ্ছে না। তাই বিজেপির দিকে আবার পা বাড়ানোর ব্যাপারে এখনও ভরসা পাচ্ছেন না শোভন। এখনও পর্যন্ত তাঁর তৃণমূলে ফেরার পাল্লাই ভারী বলেই মনে হচ্ছে।