লকডাউনে ফসলের দাম না পেয়ে আত্মঘাতী কৃষক, কোলের শিশু নিয়ে চিন্তায় স্ত্রী

674

ফাঁসিদেওয়া, ৩০ এপ্রিলঃ গলায় ফাঁস লাগিয়ে কৃষক আত্মঘাতী হওয়ার ঘটনায় বৃহস্পতিবার ফাঁসিদেওয়া ব্লকের দেমধাখাড়ি এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্য ছড়াল। এদিকে, পেশায় কৃষক মৃত নিতাই বিশ্বাস (২৬) এর স্ত্রী রুপা বিশ্বাস ২ বছরের পুত্র সন্তান নিয়ে পথে বসার দশা। পরিবার সূত্রে খবর, নিতাই বেশ কিছুদিন থেকেই আর্থিক টানাপোড়েনে নাজেহাল হয়ে পড়েছিল। কিছুক্ষেত্রে ছিল খাদ্য সংকটও। সবজির দাম পড়ে যাওয়ায় হাতে মূলধনের মাত্র আড়াই হাজার টাকাই পড়ে ছিল। এদিকে, প্রায় সাড়ে ৪ বিঘা জমিতে ফলানো ফুলকপির দাম এখন নেই বললেই চলে। এদিন সকালে অবসাদগ্রস্থ নিতাইয়ের নিজের জমির একটি শেড ঘর থেকে ঝুলন্তদেহ মৃতদেহ উদ্ধার হয়। খবর পেয়ে ফাঁসিদেওয়া থানার পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে মৃতদেহ উদ্ধার করে। পরে সেটি ময়নাতদন্তের জন্য উত্তরবঙ্গ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। ঘটনার আসল কারণ নিশ্চিত করতে পুলিশ তদন্ত শুরু করেছে।

শুধু শহর শিলিগুড়ি নয়, শিলিগুড়ি মহকুমার ফাঁসিদেওয়া ব্লক থেকেই কাঁচা সবজি বিভিন্ন জেলা হয়ে বাইরের রাজ্যেও পাড়ি দেয়। এবারে সবজির ফলন ভালো থাকলেও, বাঁধ সেঁধেছে লকডাউন। এরজেরে সকল কিছুর মতই পরিবহন ব্যবস্থা বন্ধ রয়েছে। ফলে, সবজি বাইরে যাচ্ছে না। বহু মানুষ পেশা বদলে সবজি বিক্রি করেছেন। যোগান বেশি হওয়ায় দাম একেবারেই নেই। প্রচুর কৃষক সবজি ফলিয়ে দাম পাচ্ছেন না। নিতাইয়েরও একই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। শীতের আগে ৩ বিঘা জমিতে ফলানো ফুলকপিতে লভ্যাংশ দূরের কথা, খরচের পয়সায় উঠে আসেনি। এরপর নিজের ২ বিঘা জমি এবং আড়াই বিঘা জমি লিজে নিয়ে প্রায় ৮০ হাজার টাকা খরচ এবং নিজের শ্রম দিয়ে ফুল কপি ফলিয়েছিল নিতাই। কিন্তু, ফসল কাটার আগেই করোনা সংক্রমণ রুখতে সরকারের তরফে লকডাউন ঘোষণা করা হয়। এরপরই, সব পণ্ডশ্রম। কিছু কপি জমিতে নষ্ট হচ্ছে। আবার সম্প্রতি লাগাতার বৃষ্টিতে দেড় বিঘা নিচু জমিতে চাষ করা ফুল কপি জলে তলিয়ে যায়। বেসরকারি লোন কোম্পানি থেকে ৫০ হাজার টাকা, সমিতি থেকে প্রতি মাসে ৩% সুদের হারে ৫০ হাজার টাকা, অপর একটি সমিতি থেকে ২% প্রতি মাসে সুদের হারে ১০ হাজার টাকা এবং ৬০০ টাকা প্রতি মাসে শোধের প্রতিশ্রুতিতে সোনার লোনে ৪২ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে নিতাই ফুল কপি চাষ করেছিল বলে তাঁর কাকু সুকুমার বিশ্বাস ও শ্রীপতি বিশ্বাস জানিয়েছেন।

- Advertisement -

সুকুমার বাবু আরও জানান, বছর তিনেক আগে ফাঁসিদেওয়া ভক্তিনগরের বাসিন্দা রুপা ঘোষকে নিতাই বিয়ে করে। এরপর থেকেই দাদা গৌর বিশ্বাস এবং বাবা নিরঞ্জন বিশ্বাসের সঙ্গে সে ভিন্ন হয়ে যায়। বছর খানেক পর তাঁদের এক পুত্র সন্তানও জন্ম নেয়। কৃষিকাজের ওপর ভরসা করে তাঁদের সংসার বেশ চলছিল। তবে, লকডাউনে সবজির দাম কমে যাওয়ায়, ঋণে জর্জরিত নিতাই সমস্যায় পড়ে। এদিকে, ঋণ শোধের চিন্তা এবং মাত্র আড়াই হাজার টাকায় সংসার কিভাবে চলবে, সেই চিন্তায় বেশ কিছুদিন থেকেই সে অবসাদে চলে যায়। সম্প্রতি বিষয়টি নিয়ে শিলিগুড়ির এক মনোরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেয় তাঁর পরিবার। কিন্তু, সবকিছু মিলিয়েই অবসাদগ্রস্থ নিতাই আত্মঘাতী হয়েছে বলে পরিবারের সদস্যরা দাবি করেছেন। মৃত্যুর পরও জমিতে নিতাইয়ের ফলানো ফসল পড়ে রয়েছে, কিন্তু স্বামীর দেহে প্রাণ নেই দেখে শোকস্তব্ধ স্ত্রী রুপা। কান্না ভেজা গলায় হতাশার সুরে সে জানিয়েছে, কোলের সন্তান নিয়ে আগামীদিন কিভাবে চলবে তা এখন চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে৷