রবীন্দ্র জয়ন্তীতে সৌহার্দ্যের সহাবস্থানে সুকান্ত-অর্পিতা

সুবীর মহন্ত, বালুরঘাট : রাজনৈতিক বিভেদ ভুলিয়ে বালুরঘাটকে সৌহার্দ্যের পাঠ দিলেন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ। কবিগুরুর জন্মদিনে তাঁর মূর্তিতে মাল্যদান করতে এসে দুই প্রবল প্রতিপক্ষ আলাপচারিতায় মেতে উঠলেন। সাম্প্রতিককালে বালুরঘাটে সৌজন্যের যে ছবি কার্যত নিখোঁজ হয়ে গিয়েছিল, এদিন কবিগুরুর জন্মদিনে সেই ছবি তুলে ধরলেন বালুরঘাটের প্রাক্তন ও বর্তমান দুই সাংসদ। এদিন বালুরঘাট থানা মোড়ে থাকা রবীন্দ্রনাথের আবক্ষ মূর্তিতে শ্রদ্ধা জানাতে এসে বর্তমান সাংসদ সুকান্ত মজুমদার ও প্রাক্তন সাংসদ অর্পিতা ঘোষ মেতে ওঠেন ব্যক্তিগত আলাপচারিতায়। একে অপরের খোঁজখবর নেন। সেই ছবি আরও একবার মনে করিয়ে দিয়েছে, সংস্কৃতির শহর বালুরঘাট বরাবরই সৌজন্যের রাজনীতিতে বিশ্বাসী।

মতাদর্শ ও দলীয়স্তরে পৃথক রাজনৈতিক অবস্থান হলেও এই শহরের মানুষ বিভিন্ন কাজে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করতে অভ্যস্ত। আগে রাজ্যে যখন রাজনৈতিক হানাহানি বা গোলমাল হত, তখন বালুরঘাট শান্ত থাকত। সেটা এই সৌজন্য রাজনীতির কারণেই। তবে সম্প্রতি বালুরঘাটে এই সংস্কৃতি নষ্ট হচ্ছিল বলে অভিযোগ তুলছিলেন স্থানীয়রা। বিশেষ করে গত বছর লোকসভা নির্বাচনে তৃণমূল ও বিজেপির টক্করের প্রভাব এই শহরেও পড়ে। তৃণমূলকে হারিয়ে বিজেপি জয়লাভ করে। এরপর থেকেই বিজেপি যেমন আগামী বিধানসভা নির্বাচনের আগে তৃণমূলকে আরও কোণঠাসা করতে প্রবল পরিশ্রম শুরু করেছে, তেমন তৃণমূলও বিজেপির উত্থানকে আটকাতে তাদের সাংগঠনিক কাজকর্মে ব্যাপক জোর দিয়েছে। ফলে এই দুই শিবিরের মধ্যে কার্যত মুখোমুখি লড়াই শুরু হয়েছে। সম্প্রতি ত্রাণ বিলিকে কেন্দ্র করেও দুই পক্ষ একে অপরের বিরুদ্ধে সরব হয়েছে। বিজেপির অভিযোগ, প্রশাসনের সহযোগিতা নিয়ে শাসকদল সাংসদকে ত্রাণ বিলি থেকে আটকাচ্ছে। আবার তৃণমূলের অভিযোগ, বিজেপিই মানুষকে উসকে দিয়ে তৃণমূলের ত্রাণ বিলির কাজকে খাটো করার চেষ্টা করছে। এই দাবির প্রমাণ হিসেবে তৃণমূলের তরফে বিজেপির রাজ্য সভাপতি ও শহর সভাপতির ফোনালাপের রেকর্ডিং প্রকাশ্যে আনা হয়েছে।

- Advertisement -

বর্তমান পরিস্থিতিতে জেলায় বিজেপি ও তৃণমূল নেতাদের কোনও অনুষ্ঠানে এক মঞ্চে দেখা মেলা এখন কার্যত অলীক কল্পনা। লোকসভা নির্বাচনের পর দুই রাজনৈতিক শিবিরের তরফেই এই দূরত্ব বজায় রাখা হয়েছে। এই যুযুধান দুই শিবিরকেই যেন এদিন মিলিয়ে দিলেন রবীন্দ্রনাথ। লকডাউনে এদিন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৬০তম জন্মতিথি সংক্ষেপে পালন করা হয়। থানা মোড়ে এদিন একটি ছোট অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল। উপস্থিত ছিলেন পুলিশ সুপার দেবর্ষি দত্ত, ডিএসপি (সদর) ধীমান মিত্র, ডিএসপি (ট্রাফিক) অরিন্দম পালচৌধুরী সহ অন্য পুলিশ আধিকারিকরা। এদিন সকালে বালুরঘাট পুলিশলাইন থেকে জেলা পুলিশের একটি ট্যাবলো বের হয়। সেই ট্যাবলোটি শুভায়ন হোম হয়ে থানা মোড়ে আসে। সেখানে রবীন্দ্রসংগীতের আয়োজন করা হয়। সেই অনুষ্ঠানে যোগ দিতে আসেন উত্তরবঙ্গ উন্নয়ন পর্ষদের ভাইস চেয়ারপার্সন অর্পিতা ঘোষ। তিনি কবিগুরুর প্রতিকৃতিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান। এরই মধ্যে থানা মোড়ে কবির আবক্ষ মূর্তিতে মাল্যদান করতে আসেন সাংসদ সুকান্ত মজুমদার ও বিজেপির শীর্ষ নেতারা। সরকারি অনুষ্ঠান চলছে দেখে তাঁরা একটু দূরেই দাঁড়িয়ে থাকেন। বিষয়টি নজরে আসে রাজ্যসভার সাংসদ অর্পিতাদেবীর। তিনি নিজে মাল্যদান করে সোজা সুকান্তবাবুর কাছে গিয়ে তাঁকে মাল্যদান করার কথা বলেন। মাল্যদানের পর তাঁরা একে অপরের সঙ্গে সৌজন্যমূলক আলাপচারিতাও করেন।

অর্পিতা বলেন, মাল্যদান করতে থানা মোড়ে গিয়েছিলাম। দেখতে পাই, বিজেপি সাংসদ ও নেতারা দূরে দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁদের মাল্যদান করার জন্য এগিয়ে আসতে বলি। যিনি সবাইকে মিলিয়েছেন, সেই রবীন্দ্রনাথের জন্মদিন রাজনীতি করার প্ল্যাটফর্ম হতে পারে না। রবীন্দ্রনাথ কারও ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। আমার মনে হয়েছে তাঁরা হয়তো মাল্যদান করতে এসেছেন। দূরে দাঁড়িয়ে আছেন। তাই তাঁদের ডেকে নিই। রাজনৈতিক ক্ষেত্রে মতবিরোধ থাকবেই। তিনি রাজনৈতিক ক্ষেত্রে পাঁচটা কথা বলবেন। আমিও সেই পাঁচটি উত্তর দেব। তবে রবীন্দ্রনাথের জন্মদিন নিয়ে রাজনীতি করা ঠিক নয় বলেই মনে করি। সুকান্তবাবু বলেন, এদিন দলের শীর্ষস্থানীয় নেতৃত্বের সঙ্গে কবিগুরুর মূর্তিতে মাল্যদান করতে গিয়েছিলাম। সেখানে সরকারি অনুষ্ঠান চলছিল। আমাকে ওই অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। তাই ওই অনুষ্ঠান শেষেই মাল্যদান করব বলেই সামাজিক দূরত্ব বিধি মেনে দূরে দাঁড়িয়েছিলাম। হঠাৎ উনি এগিয়ে এসে কথাবার্তা বলেন। আমরাও বলি। বালুরঘাটের সংস্কৃতি অনুযায়ী এটাই হওয়া উচিত। রাজনৈতিক মতাদর্শগতভাবে আমরা আলাদা হলেও ব্যক্তিগতভাবে আমি ওঁকে সম্মান করি। আমরা কেউই কারোর শত্রু নই।