চাঁদকুমার বড়াল, কোচবিহার : যে হাত মশারি বোনে, নাইটি বানায়, যে হাত কাপড় ফেরি করে, সেই হাত খড়বিচুলিতে কাদা-মাটি দিয়ে প্রতিমাও গড়ে। সংসারের হাল টানতে সারাবছর তাঁরা বাড়ি-বাড়ি ঘুরে জামাকাপড় বিক্রি করেন। সম্পর্কে তাঁরা ননদ-বউদি। কিন্তু পুজো এলেই বদলে যায় তাঁদের পেশা। কাপড় ফেরির কাজ ছেড়ে হযে ওঠেন শিল্পী। তখন গ্রাম ছেড়ে ১০ কিলোমিটার দূরে শহরে চলে আসেন দুজন। সারাদিন কাদা-মাটি মেখে দুর্গাপ্রতিমা গড়েন এই দুই অন্য দুর্গা। এভাবেই তাঁরা সংসার টেনে চলেছেন বছরের পর বছর। পুজো মানে তাই তাঁদের কাছে প্রতিমা তৈরি করে দুমুঠো অন্নের সংস্থান।  কোচবিহার শহরের কুমোরটুলিতে এখন জোর ব্যস্ততা চলছে। দিন-রাত এক করে সেখানে চলছে প্রতিমা তৈরির কাজ। ঘাড়ের উপর রয়েছে বিশ্বকর্মাপুজো। তারই পাশাপাশি চলছে দুর্গাপ্রতিমা গড়ার কাজ। কুমোরটুলির এই ব্যস্ততার মধ্যেই এই দুই মহিলার কাজ নজর কেড়েছে। সারাবছর তাঁদের এই কাজে দেখা যায় না। বছরের বাকি সময়টা অন্য কাজেই কেটে যায় তাঁদের। তা-ও তাঁদের হাতে প্রতিমা গড়ার সূক্ষ্মতা দেখে অবাক হতেই হয়।

তাঁদের একজন সুমিতা পাল। বাড়ি কোচবিহার শহর ছাড়িযে মহিষবাথান এলাকায়। বছর পাঁচেক হল স্বামী মারা গিয়েছেন ক্যানসারে। সেই থেকে তাঁর কাঁধে এসে পড়েছে সংসারের হাল টানার ভার। বাড়িতে দুই ছেলে ছাড়াও রয়েছেন শ্বশুর-শাশুড়ি। বছরের অন্য সময়ে বাড়িতে মশারি, নাইটি তৈরি করেন সুমিতা। তারপর এই গ্রাম থেকে সেই গ্রাম ঘুরে ঘুরে সেগুলি বিক্রি করতে হয়। এভাবেই ছেলেদের পড়াশোনা করানো, সংসার চালানো, সবই সামলান। অনেকটা একইরকম জীবন শিপ্রা পালের। তাঁর বাড়ি কোচবিহার শহর থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে। জায়গাটার নাম ডডেয়ারপাড়। শিপ্রার বাড়িতে স্বামী ও এক ছেলে রয়েছে। শিপ্রাও বাড়িতে মশারি, নাইটি তৈরি করেন। তারপর একইভাবে ঘুরে ঘুরে বিক্রি করেন সেগুলো।  দুজনেই বলছেন, প্রতিদিনই তাঁদের লড়াই চলছে। ছেলেদের লেখাপড়া শেখানোর পাশাপাশি সংসারও চালাতে হয়। ছোটোবেলায় বাড়িতে প্রতিমা তৈরি হতে দেখেছেন তাঁরা। সেখান থেকেই দেখে দেখে শিখে নেওয়া। জীবনের নানা ওঠাপড়া ও লড়াইয়ে ভাসতে ভাসতেও ভোলেননি সেই শিক্ষা। আর সেটাই এখন তাঁদের কাজে আসছে। কাজ জানা থাকায় বাড়তি কিছু রোজগারের জন্য পুজোর সময় প্রতিমা তৈরি করেন দুজন। ঘরের কাজ সামলে দুজনেই সকাল ৮টার মধ্যে শহরের কুমোরটুলির কারখানায় চলে আসেন। সারাদিন প্রতিমা গড়ার কাজ সেরে রাতে ৮টায় বাড়ির পথ ধরেন। বিশ্বকর্মাপুজো, দুর্গাপুজো, লক্ষ্মীপুজো পেরিযে কালীপুজো অবধি চলবে তাঁদের এই ব্যস্ততা। তারপর আবার ফিরে যাবেন মশারি বোনা আর কাপড় ফেরির পেশায়। ফের ফিরে আসবেন আগামী বছর। শহরের যে কারখানায় কাজ করেন সুমিতা ও শিপ্রা, সেখানকার মালিক সুজিত পাল বলেন, ওঁরা দুজনেই চমত্কার কাজ করেন। কয়েক বছর ধরেই এখানে কাজ করছেন। প্রতিদিন ২৫০ টাকা করে দেওযা হয়।