ফ্লোরেন্স নাইটিংগেল পুরস্কার পাচ্ছেন নাগরাকাটার নার্স সুনীতা

271

নাগরাকাটা: ফ্লোরেন্স নাইটিংগেল পুরস্কার পাচ্ছেন নাগরাকাটার উত্তর নুনখাওয়াডাঙ্গার সুনীতা দত্ত। ইতিমধ্যে ইন্ডিয়ান নার্সিং কাউন্সিলের তরফে এবিষয়ে চিঠি পৌঁছে গিয়েছে স্বাস্থ্য দপ্তরে। ভার্চুয়াল মাধ্যমে তিনি ওই পুরষ্কার গ্রহন করবেন রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দের কাছ থেকে। এনিয়ে জলপাইগুড়ি জেলা পরপর ৪ বার ফ্লোরেন্স নাইটিংগেল পেল।

সামান্য থেকে অসামান্য হয়ে ওঠার পথে অনেক ঘাত প্রতিঘাত সইতে হয়েছে তাঁকে। জানা গিয়েছে, একটা সময় এলাকার ১০ জনের মধ্যে ৮ জন মহিলার প্রসবই হত বাড়িতে। বিগত ১৪ বছরের নিরলস পরিশ্রমে সেই সংখ্যা এখন শূন্য এনেছেন তিনি। শুধু তাই নয়। একের পর এক বাল্য বিবাহ আটকেছেন বহু বাধা বিপত্তিকে অগ্রাহ্য করেই। সেই কাজ এখনও অব্যাহত। গ্রামের পঞ্চায়েত সদস্য সহ আরও বেশকিছু বাসিন্দাদের নিয়ে টিম গড়ে নিয়মিত স্বাস্থ্য সচেতনতা ও পরিবার পরিকল্পনার বার্তা পৌঁছে দিচ্ছেন প্রত্যন্ত এলাকায়। সাইকেল চেপে গোটা তল্লাট ঘুরে বেড়িয়ে খোঁজ খবর রাখেন গ্রামবাসীদের নানা সামাজিক সমস্যার। এসবেরই স্বীকৃতি হিসেবে এবার দেশের সেরা নার্সের খেতাব ‘ফ্লোরেন্স নাইটিংগেল’ পাচ্ছেন তিনি।

- Advertisement -

নাগরাকাটার আংরাভাসা দুই গ্রাম পঞ্চায়েত উত্তর নুনখাওয়াডাঙ্গা উপ স্বাস্থ্য কেন্দ্রে ২০০৬ সাল থেকে সুনীতা দত্ত এএনএম নার্স হিসেবে কর্মরত। তাঁর কৃতিত্ব ও কাজের ভূয়সী প্রশংসা করছেন স্বাস্থ্য কর্তারাও। কোভিড-১৯ এর উত্তরবঙ্গের অফিসার অন স্পেশাল ডিউটি ডাঃ সুশান্ত রায় বলেন, ‘জলপাইগুড়ি জেলার মুকুটে আরও একটি পালক সংযুক্ত হল। ওঁকে কুর্ণিশ জানাই।’ নাগরাকাটার ব্লক স্বাস্থ্য আধিকারিক ডাঃ সুপর্ণ হালদার বলেন,‘ সুনীতা আমাদের প্রত্যেকের গর্ব। যেভাবে প্রত্যন্ত এলাকাতে স্বাস্থ্য পরিসেবা পৌঁছে দিতে তিনি অক্লান্ত পরিশ্রম করে চলেছেন তাঁর জন্য কোনও প্রশংসাই যথেষ্ট নয়।’

এএনএম নার্স হিসেবে সুনীতার পথ চলা শুরু। গ্রাসমোড় চা বাগানের বিএস কোম্পানি উপস্বাস্থ্য কেন্দ্র দিয়ে সেখান দু মাস কাজ করার পর ক্যারন চা বাগানের উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রটি শুরু হয় তাঁর হাত দিয়ে। এরপর বদলি হয়ে চলে যান উত্তর নুনখাওয়াডাঙ্গায়। সেখানে তাঁকে সামলাতে হয় উত্তর ও দক্ষিন নুনখাওয়াডাঙ্গার পাশাপাশি পূর্ব খয়েরকাটা ও দক্ষিন ধোন্দাসিমলার মতো মোট ৪টি প্রান্তিক এলাকাকে। জনসংখ্যা প্রায় হাজার পাঁচেক। এর বাইরে মেচপাড়া নামে একটি এলাকার আরও হাজার খানেক বাসিন্দার কাছেও স্বাস্থ্য পরিসেবা পৌঁছে দিতে একা লড়ে চলেছেন তিনি। সঙ্গী হিসেবে পেয়েছেন উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রের সেকেন্ড এএনএম হিমানী রায় সহ দুজন আশা কর্মীকে। এই পুরষ্কার তিনি উৎসর্গ করছেন স্বাস্থ্য দপ্তর ও গ্রামবাসীদের। সুনীতা বলেন, ‘ যে কোন স্বীকৃতি কাজের স্পৃহা আরও বাড়িয়ে দেয়। ফ্লোরেন্স নাইটিংগেলের মতো জাতীয় পুরষ্কার কোনদিন পাব ভাবিনি। এখনও বহু কাজ বাকি। বাল্য বিবাহের প্রবণতা যে কোন মূল্যে সন্মিলিতভাবে রুখতেই হবে। আমার কাজের পরিধিভুক্ত এলাকার ৪ জন পঞ্চায়েত সদস্যর কাছেও ঋণী থাকলাম।’

প্রাতিষ্ঠানিক প্রসবের তালিকায় একটা সময় ওই গ্রামের অবস্থান একেবারেই খারাপ ছিল। পরিবার পরিকল্পনাতেও খুব একটা আগ্রহ দেখাতেন না কেউ। কম বয়সে পালিয়ে বিয়ে করার প্রবণতা ক্রমশ বেড়ে চলছিল। এসবের বিরুদ্ধেই সুনীতা দত্ত কাজ শুরু করেন নীরবেই। পাশে পান গ্রামের শুভবুদ্ধি সম্পন্নদের। যার নিটফল সেখানে আজ বাড়িতে প্রসব হয় না। ২০০৮ সালে ১ জনকে দিয়ে শুরু করে ১২ বছর পর প্রায় দুশো মহিলাকে জন্ম নিয়ন্ত্রণ প্রকল্পে সামিল করাতে পেরেছেন। সস্তাতেও যে পুষ্টিকর খাবার মেলে তা গর্ভবতী মায়েদের শিখিয়ে দিয়ে অপুষ্ট শিশুর জন্মে রাশ টেনেছেন সেই কবেই। নাবালিকার বিয়ে আটকেছেন একের পর এক। প্রকৃত অর্থেই লেডি উইথ দ্য ল্যাম্প ফ্লোরেন্সের মতোই সুনীতা এখন উত্তর নুনখাওয়াডাঙ্গার আলোকবর্তিকা।