স্বপ্ন ধরতে মহানন্দায় সাঁতার সুশান্তর

রাজশ্রী প্রসাদ, পুরাতন মালদা : মহানন্দার জল ঘাট ছাপিয়ে বাঁধের গায়ে গা ঘসছে। দিকশূন্য ভেসে যাওয়া কচুরিপানা আর ঘরছাড়া শাঁপলার দলে শালিখ, বকের মৌরসীপাট্টা। আলতা সিঁদুর মাখা দুগ্গা ঠাকুরের মুখ মৃদু ঢেউয়ে দুলে দুলে ভেসে যায় হয়তো কৈলাশের দিকে। বাঁধের ওপর একটু একটু করে স্পষ্ট হয় হামাগুড়ি দেওয়া আবছায়া অবয়ব। একটুক্ষণ থেমে দেখে নেওয়া ভেসে যাওয়া মুখগুলোকে। তারপর মওকা বুঝে বুকে ভর দিয়ে ঝুপ করে ঝাঁপিয়ে পড়া ভরা মহানন্দায়-স্বপ্ন ধরতে।  ঢেউ কাটিয়ে ভেসে যাওয়া কাঠামো ধরে তীরে ঠেকায় সুশান্ত। ফি বছর এভাবেই দশমীর বিসর্জনে স্বপ্নের বোধন হয় বছর বাইশের সুশান্ত মণ্ডলের।

পুরাতন মালদার সদরঘাটে নদীপাড়ের বস্তি এলাকায় ঘর সুশান্তর। বিশেষভাবে বলার কিছু নেই বলেই ঠিকানা বাতলাতেও আড়ষ্টতা ধরা পড়ে। পোলিয়ো আক্রান্ত দুই পা দাঁড়ানোর ক্ষমতাটুকুও কেড়ে নেওয়ায় আত্মবিশ্বাসও যেন হাঁটু মুড়ে বসে। মুখে সহানুভূতি দেখানো সমাজেও আখেরে নিজেকে ব্রাত্যজন ভাবাটা এখন অভ্যাসে পরিণত। তাই নিতান্ত অগোচর প্রিয় তার। এহেন সুশান্ত অবশ্য সারাবছর অপেক্ষায় থাকেন বিজয়া দশমীর। পুজোর আনন্দের থেকেও ঢের বেশি আনন্দ তাঁর দশমীতে। লাল পেড়ে শাড়ি পরা এয়োতিরা যখন একে অপরকে সিঁদুর রাঙা করে মায়ের বিদায়ে বুক ভাসায়, তখন মুখে হাসি ফোটে সুশান্তর। ঢাক কাঁসরের আওয়াজে আকাশ বাতাস মুখরিত করে ঘাটের পানে চলেন মা।

- Advertisement -

পিছে পিছে প্রায় হামাগুড়ি দিয়ে চলেন সুশান্ত, নিঃশব্দে। প্রবল হৈ হট্টগোলের মাঝে বাঁধের একপাশে চুপ করে দাঁড়ান তিনি। এরপর প্রবল জয়ধ্বনিতে ভাসান হয় মায়ের। স্রোতের টানে ভেসে যায় কাঠামো। ওই কাঠামোতেই তো লুকোনো থাকে স্বপ্ন। এক একটা বড়ো কাঠামো বিক্রি হয় হাজার, দেড় হাজার টাকায়। সাত পাঁচ না ভেবে জলে ঝাঁপান সুশান্ত। স্রোতে গা ভাসিয়ে কাঠামো ধরে তীরে নিয়ে আসেন তিনি। দশমী, একাদশীতে দুপুর থেকে রাত পর্যন্ত এভাবেই কাটে তাঁর।

সুশান্ত বললেন, পোলিয়োয় পা দুটো অকেজো। দাঁড়াতে পারি না বলে হামাগুড়ি দিয়ে চলাফেরা করতে হয়। তবে সাঁতার কাটতে পারি। তাই ভাসানের পর কাঠামোগুলো ধরে এনে নদীর পাড়ে জমা করি। আমার সঙ্গে কয়েকজন বন্ধুও কাঠামো ধরে। প্রতিমার কাঠামো বিক্রি করে পাঁচ থেকে ছয় হাজার টাকা মেলে। ওই টাকা দিয়ে নতুন জামাকাপড়ের পাশাপাশি দুপয়সা সঞ্চয় হয়।

আর পাঁচটা সাধারণ যুবকের মতো জীবিকা নির্বাহের ইচ্ছে এভাবেই পূর্ণ হয় সুশান্তর। প্রতিকূলতা সত্ত্বেও এমন অসাধ্য সাধনে অবশ্য আশ্চর্য হন না তাঁর বন্ধুরা। টুবাই সাহা, জিতু সাহানির মতো বন্ধুরা তাই জানালেন, হামাগুড়ি দিয়ে জলে নামে সুশান্ত। আমাদের থেকেও ভালো সাঁতার জানে ও। কাঠামো ধরতে ওর জুরি মেলা ভার। কাঠামো বিক্রি করে টাকা পেলে সবাইকে খাওয়ায়। সব শুনে লাজুক হাসে সুশান্ত। শোনা যায় ঢাক কাঁসরের আওয়াজ। বিসর্জনের জন্য ঘাটের দিকে এগিয়ে আসে আরেকটি দল। হামাগুড়ি দিয়ে ফের জলে নামে সুশান্ত-স্বপ্ন ধরবে বলে।