যাবতীয় সঞ্চয় পুঁজি করে টোকিওয় সুশীলা

নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা : নিজের যাবতীয় সঞ্চয় শেষ করে টোকিওতে পদক জয়ের স্বপ্ন দেখছেন মনিপুরী জুডোকা সুশীলা দেবী।

টোকিও রওনা দেওয়ার আগে নিজের পকেট দেখিয়ে তাঁকে বলে যেতে হল, আপাতত একটাও টাকা নেই আমার কাছে। পুরো খালি। যেখানে যা ছিল, সবটাই লাগিয়ে দিয়েছি, অলিম্পিক প্রস্তুতিতে। আগামী ২৪ জুলাই ৪৮ কেজি বিভাগে নামছেন সুশীলা। শুধু সঞ্চয় ভেঙ্গে ফেলাই নয়, অলিম্পিকের যোগ্যতার্জনের জন্য বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় নামতে গিয়ে নিজের প্রিয় মারুতি অলটো গাড়িটাও বিক্রি করে দিতে হয়েছে তাঁকে।

- Advertisement -

২০১৪ সালের গ্লাসগো কমনওয়েলথ গেমসে ব্রোজ্ঞজয়ীর অবশ্য জীবনটা কখনও সরলরেখায় কাটেনি। ২০১৮-তে হ্যামস্ট্রিংয়ে চোটের জন্য জুডো ছেড়ে দিতে হয়। টানা তিনমাস মনিপুরের বাড়িতে গিয়ে বসে ছিলেন। কিন্তু কোচ জীবন সিং সবসময় সঙ্গে থেকেছেন সুশীলার। খানিকটা তাঁর উৎসাহ, বাকিটা নিজের মানসিক জোর ও চেষ্টায় ফের ম্যাটে ফেরেন তিনি।

সেসময়ে কথা নিজেই বলেছেন সুশীলা, আমি একেবারে ভেঙ্গে পড়েছিলাম। মনে হয়েছিল, আমার কেরিয়ার একেবারে শেষ। সেসময় আমার লক্ষ্য ছিল মূলত এশিয়ান গেমসে নামা। যা আমাকে অলিম্পিকের জন্য তৈরি হতে সাহায্য করবে। তবে জীবন স্যার সেসময় পাশে ছিলেন। সম্ভবত কোচের প্রেরনাতেই ফের জুডোয় ফিরতে পেরেছেন তিনি। ২০১৮ ও ২০১৯ পরপর দুবার হংকং ওপেনে রূপো জেতেন সুশীলা। কিন্তু অলিম্পিকের দরজা খুলতে এরপরেও যথেষ্ট কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে তাঁকে।

নিজের টাকা খরচ করে করে এই সময়ে তাঁকে বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় নামতে হয়েছে। সুশীলার দাদা শিলাক্ষী সিং দানিয়েছেন, এই সময়ে ওকে নিজের টাকাই খরচ করতে হয়েছে। ফেডারেশন বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপ ও এশিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপে গেলে টাকা দেয়। কিন্তু যোগ্যতার্জনের জন্য গ্রাঁ প্রিঁ বা গ্র‌্যান্ড স্ল্যামের মতো যেসব টুনামেন্টে নামতে হয়, তার জন্য কোনো টাকা দেয় না। জুডোয় আমরা কখনও পদক জিতিনি। তাই এর জন্য স্পনসরও পাওয়া যায় না। প্রতিটা টুর্নামেন্টের জন্য কমবেশি ৫০ হাজার টাকার মতো খরচ হত। ফলে ওকে প্রচুর ধার করতে হয়েছে বিভিন্ন জায়গা থেকে।

কিন্তু সমস্যাটা হল এরপরেই। কোভিড-১৯ এসে পড়ায় যাবতীয় প্রস্তুতিই ধাক্কা খেল। ঘরে বসেই নিজেকে প্রস্তুত করতেন সুশীলা। ছোটবেলার কোচের কাছ থেকে ম্যাট কিনে আনা থেকে স্থানীয় এক তরুন জুডোকাকে তাঁর সঙ্গে অনুশীলন করতে বলা পর্যন্ত সবই করেছেন সেসময়। এরপরেও অবশ্য ঝামেলার হাত থেকে রেহাই মিললো না। সব স্বাভাবিক হওয়ার পরেও গত এপ্রিলে এশিয়া-ওশেনিয়া যোগ্যতার্জন পর্বে যোগ দিতে পারেননি দলের এক সদস্যের করোনা ধরা পড়ায়।

অথচ সুশীলা ওখান থেকে পদক আনার ব্যাপারে নিশ্চিত ছিলেন। সেক্ষেত্রে সরাসরি অলিম্পিকে যোগ্যতার্জন করে ফেলতে পারতেন। অবশেষ গত ২৫ জুন তিনি মহাদেশীয় কোটায় তিনি অলিম্পিক যাওয়া নিশ্চিত করেন। ৯৮৯ পয়েন্ট নিয়ে তিনি এশিয়াতে সাত নম্বরে ছিলেন। আর প্রথম ১০ জন এই কোটা পেতে পারতেন। এই কোটা পেতেই ফ্রান্সে গিয়ে কিছুদিন প্রস্তুতি নিয়েছেন অলিম্পিকের জন্য।

আপাতত বাড়তি কোনো প্রত্যাশা নেই। জীবন সিং মনে করেন, জুডোকারা যোগ্যতার্জন করতেই এখনও হিমশিম খাচ্ছে। অথচ আমাদের পদকের কথা ভাবা উচিৎ। যদি সব প্রতিযোগীতায় নামতে পারে ওরা তাহলে কিন্তু পদক আসবে। সুশীলা মাত্র একমাস আগে অলিম্পিকের কোটা পেয়েছে। ফলে মাত্র এই কদিনের প্রস্তুতিতে পদক আসবে, এটা ভাবা ঠিক নয়। বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশীপ আর অলিম্পিক কিন্তু এক নয়।

তবে জীবনযুদ্ধে লড়াকু সুশীলা এখানেও হারার আগে হার মানতে রাজি নন। ভুগছেন না স্নাযুর চাপেও। নিজের সেরাটা দিয়ে ফিরবেন বলে জানিয়েছেন তিনি।