খড়িবাড়ির আদিবাসী মেয়েদের মধ্যে প্রথম ডাক্তার হচ্ছেন স্বপ্না

1763

মহম্মদ হাসিম, খড়িবাড়ি : স্বপ্না মুন্ডার হাসিটা খুবই মিষ্টি। কিন্তু এই মিষ্টি হাসির পিছনে কতটা জেদ আর অধ্যবসায় লুকিয়ে আছে তা অনেকেরই অজানা। কথায় বলে, কষ্ট করলে কেষ্ট মেলে। স্বপ্নারও মিলেছে। কথায় বলে, লোকের কথায় কান দিতে নেই। স্বপ্নাও দেননি। ফলটা হাতেনাতে মিলেছে। খড়িবাড়ি ব্লকের ফুলবাড়ি চা বাগানের বাসিন্দা স্বপ্না সর্বভারতীয় নিট পাশ করে উত্তরবঙ্গ মেডিকেল কলেজে ডাক্তারি পড়ার সুযোগ পেয়েছেন। খড়িবাড়ি ব্লকে আদিবাসী মেয়েদের মধ্যে প্রথম হিসাবে। স্বপ্নাকে ঘিরে এলাকায় এখন দারুণ খুশির হাওয়া বইছে।

রানিগঞ্জ পানিশালি গ্রাম পঞ্চায়েত থেকে প্রায় চার কিলোমিটার দূরে বাতাসির ফুলবাড়ি চা বাগানের খাললাইনে শ্রমিক আবাসনে একটা টিনের চালার ঘরে স্বপ্নাদের থাকা-খাওয়া। বাড়িতে বাবা-মা, ক্লাস টেনের পড়ুয়া বোন ও দিদাও থাকেন। বাবা রতনলাল মুন্ডা এই বাগানেরই শ্রমিক। মা শান্তিদেবী বাগানের স্বাস্থ্যকর্মী। পরিবারে অভাব নিত্যসঙ্গী। তবুও রতন-শান্তি দুই মেয়ের পড়াশোনায় কোনও খামতি রাখতে নারাজ। ২০১৬ সালে বাতাসি শাস্ত্রীজি হাইস্কুল থেকে ৮০ শতাংশ নম্বর পেয়ে স্বপ্নার মাধ্যমিক পাশ। পরবর্তীতে বিজ্ঞান নিয়ে পড়তে চাইলেও প্রতিনিয়ত নানা বাধা। স্বপ্নার কথায়, আমার দ্বারা বিজ্ঞান পড়া হবে না বলে চেনাশোনা অনেকেই সেই সময় আমাকে মুখের ওপর বলে দিয়েছিলেন। সেই সময় স্কুলের শিক্ষকরাই আমাকে সাহস জোগান। বাড়ির আশপাশে যোগাযোগ ব্যবস্থা খুবই খারাপ। পরিবার ঋণ নিয়ে স্বপ্নাকে শিলিগুড়ির মার্গারেট সিস্টার নিবেদিতা স্কুলে বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি করে। সেখানে হস্টেলে থেকে পড়াশোনা চালিয়ে ২০১৮ সালে উচ্চমাধ্যমিক পাশ। গতবার নিটে বসলেও সাফল্য অধরাই ছিল। দীর্ঘমেয়াদি প্রচেষ্টা এবারে অবশ্য স্বপ্নাকে বিফল করেনি। আজ ডাক্তারি পড়ার রাস্তায় দাঁড়িয়ে স্বপ্না বলছেন, স্বাস্থ্যকর্মী হিসাবে মাকে দিনরাত পরিষেবা দিতে দেখেছি। এই সুবাদেই মনে চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্নটার জন্ম। চেনাশোনা অনেককেই দেখেছি উত্তরবঙ্গ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের পরিষেবার বিষয়ে অবগত নন। এছাড়া, বেসরকারিভাবে চিকিৎসার খরচ জোগাতে গিয়ে অনেকেরই ছেলেমেয়ের পড়াশোনায় কোপ পড়েছে। চিকিৎসক হয়ে আমি এই মানুষগুলিরই পাশে দাঁড়াতে চাই।

- Advertisement -

স্বপ্নাকে সংবর্ধনা জানাতে এখন বাড়িতে শুভ্যানুধাযীদের ভিড়। পিসতুতো দাদা জগমোহন মুন্ডা বলছেন, ও যে কতটা পরিশ্রম করে আজ এই জায়গায় পৌঁছেছে তা কেবলমাত্র আমরাই জানি। মেয়ে ডাক্তারি পড়া সম্পূর্ণ করতে এডুকেশন লোন নেওযা হবে বলে মা শান্তিদেবী জানান। তিনি বলছেন, আদিবাসী সমাজের ছেলেমেয়েরা সাধারণত বিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা করতে চায় না। কিন্তু এবারে স্বপ্নাকে দেখে ওদের এই ধারণা বদলালে আমরা সবচেয়ে খুশি হব।