ভোট মিটতেই স্বাস্থ্যসাথীর কার্ড বিলি বন্ধ

475

চাঁদকুমার বড়াল, কোচবিহার : বিধানসভা নির্বাচন মিটতেই ধামাচাপা পড়েছে রাজ্য সরকারের স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্প। জেলায় জেলায় এখন স্বাস্থ্যসাথীর কার্ড বিতরণ বন্ধ রেখেছে রাজ্য সরকার। করোনাকালে বেশি করে কার্ডের প্রয়োজনের সময় তা না পেয়ে বিপাকে পড়েছেন বহু মানুষ। কেন কার্ড বিতরণ বন্ধ, তা নিয়ে অবশ্য আধিকারিক থেকে মন্ত্রী কারও পরিষ্কার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। রাজ্যের স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য শুক্রবার বলেন, কবে কার্ড বিতরণ চালু হবে সেটা দেখা হচ্ছে। যাঁদের কার্ডের দরকার তাঁরা পাবেন। দপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে।

রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনের আগে দুয়ারে সরকার প্রকল্প চালু করেছিল রাজ্য সরকার। ২০২০ সালের ১ ডিসেম্বর থেকে এই প্রকল্পটি চালু করেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সেই সময় দুয়ারে সরকারের ক্যাম্পগুলিতে স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্পের জন্যও আবেদন জমা নেওয়া হয়েছিল। ৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত চিকিৎসা করা যাবে এই আশায় জেলায় জেলায় স্বাস্থ্যসাথীর আবেদনই বেশি পড়েছিল সেই সময়। সরকারও ভোটের আগে এনিয়ে ব্যাপক প্রচার করেছিল। মানুষের ভিড় সামলাতে স্বাস্থ্যসাথীর কাউন্টার বাড়ানো  হয় সব ক্যাম্পেই। এমনকি যাদের ইউআরএন (ইউনিক রেজিস্ট্রেশন নম্বর) তৈরি হয়েছিল তাঁদের  বায়োমেট্রিক এন্ট্রি করে শিবিরেই স্বাস্থ্যসাথী  কার্ড দিয়ে দেওয়া হয় বহু জায়গায়।

- Advertisement -

চলতি বছরের ২৬ ফেব্রুয়ারি  রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচন ঘোষণার দিন থেকে স্বাস্থ্যসাথীর কার্ড বিলি বন্ধ হয়ে যায় নির্বাচনি আচরণবিধির জন্য। তারপর ভোট মিটে গিয়ে নতুন সরকার গঠন হয়েছে। ফের তৃণমূল কংগ্রেস ক্ষমতায় এসেছে। কিন্তু এখনও পর্যন্ত স্বাস্থ্যসাথীর কার্ড বিলি নিয়ে রাজ্য থেকে কোনও নির্দেশিকা জেলায় এসে পৌঁছায়নি। ফলে যাঁদের কার্ডের আবেদন করে রেখেছেন তাঁরা যেমন কার্ড পাচ্ছেন না, পাশাপাশি নতুন আবেদনও বন্ধ রয়েছে। তবে যাঁদের কার্ড হয়ে রয়েছে তাঁদের কোনও পরিবারের জটিল রোগের ক্ষেত্রে কার্ডের খুব প্রয়োজন থাকলে তা খতিয়ে দেখে দেওয়া হচ্ছে বলে জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গিয়েছে। তবে তাতেও অনেক কাঠখড় পোড়াতে হচ্ছে।

আমজনতা অবশ্য বলছে, ভোটের আগে সরকার স্বাস্থ্যসাথীর কার্ডের সুবিধার কথা বলে সব পরিবারকে কার্ড দেওয়ার কথা ঘোষণা করেছিল।ভোট মিটতেই তা উধাও হয়ে গিয়েছে। যাঁদের কার্ড রয়েছে তাঁরাও যে সেই কার্ড নিয়ে খুব একটা সুবিধা পেয়েছেন, এমনটাও নয়। বেসরকারি হাসপাতালগুলিতে এই কার্ডে চিকিৎসা করাতে গিয়ে হয়রানির ঘটনা আকছার ঘটছে বলে সব জেলাতেই  অভিয়োগ রয়েছে।

গোটা বিষয়টি নিয়ে জেলা প্রশাসনের কর্তারাও মুখে কুলুপ এঁটে রয়েছেন। এমনকি স্বাস্থ্যসাথী সংক্রান্ত তথ্যও তাঁরা দিতে চাইছেন না। কোচবিহার জেলায় দুয়ারে সরকার ক্যাম্পে কত মানুষ স্বাস্থ্যসাথীর কার্ডের আবেদন করেছিলেন, সেই তথ্য অবশ্য জেলা প্রশাসন দিতে চায়নি। তবে তাঁদের দাবি, সব মিলিয়ে জেলায় ১ লক্ষ ৪০ হাজার ৩৩ জনকে ক্যাম্পে আবেদনের ভিত্তিতে কার্ড দেওয়া হয়েছে।

এদিকে, কোচবিহার পুরসভা সূত্রে জানা গিয়েছে, কোচবিহার শহরে ২০টি ওয়ার্ড থেকে দুয়ারে সরকার প্রকল্পে ৮,৯০০টি পরিবার স্বাস্থ্যসাথী কার্ডের আবেদন করেছিল। তার মধ্যে ১,০৩৭টি পরিবারকে কার্ড দেওয়া হয়েছে। পুরসভার হাতে আরও ২,৯২৬টি পরিবারের কার্ড  রয়েছে। কিন্তু ফের কার্ড দেওয়া শুরুর নির্দেশ না আসায় সমস্ত কার্ড জমা রয়েছে। আরও যেসব পরিবার আবেদন করেছিল তাদের কার্ড এখনও পুরসভায় আসেনি বা তৈরিই হয়নি।

সিপিএমের কোচবিহার জেলা সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য মহানন্দ সাহা বলেন, ভোটের আগে স্বাস্থ্যসাথী নিয়ে চমক দিয়েছিল তৃণমূল। উন্মাদনা তৈরি করা হয়েছিল। ভোটে জেতার পর এখন আর কার্ড দেওয়ার কথা মনে হচ্ছে না। আর কার্ড নিয়ে বেসরকারি হাসপাতালে তো মানুষ  হয়রান হচ্ছেন। অনেকের পুরোনো কার্ড রিনিউয়ালও হচ্ছে না বলে অভিযোগ করেন তিনি। বিজেপির বিধায়ক মিহির গোস্বামী বলেন, কেন্দ্রের স্বাস্থ্য প্রকল্পের কার্ড এ রাজ্যের মানুষকে তৃণমূল নিতে দিল না। আর তাদের স্বাস্থ্যসাথী কার্ড তো ভোটের আগে ভাঁওতা ছাড়া আর কিছুই নয়।

তৃণমূলের জেলা সভাপতি পার্থপ্রতিম রায় বলেন, ভোটের সময় নিয়মনীতির জন্য কার্ড দেওয়া যায়নি।  এখন করোনা পরিস্থিতি চলছে। আশা করছি শীঘ্রই কার্ড দেওয়া শুরু হবে। কোচবিহার জেলায় কত কার্ড দেওয়া হয়েছে আর কতজনকে দেওয়া হবে, এসব নিয়ে আমি প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলব।